মন্দির বানাতে এসে  মসজিদ নির্মাণ করেন মিস্ত্রিরা

Friday, May 7th, 2021

দিনাজপুর প্রতিনিধি :; দিনাজপুর জেলায় যে কয়টি ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম নয়াবাদ মসজিদ। জেলার কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের নয়াবাদ মিস্ত্রিপাড়া গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক এ মসজিদটি।

প্রায় ৩০০ বছর আগে ১৭২২ সালে তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা প্রাণনাথ বর্তমান কাহারোলের কান্তনগর গ্রামে মন্দির নির্মাণের জন্য মধ্যপ্রাচ্য (খুব সম্ভবত মিসর) থেকে একদল মিস্ত্রিকে নিয়ে আসেন। তাদের সবাই ছিলেন মুসলমান ও ধর্মপ্রিয়। তাই মন্দির নির্মাণকাজে এসেও তারা ভুলেননি নিজ ধর্ম পালন করতে।

এ কান্তজির মন্দির নির্মাণকালীন সময় মন্দিরের পাশেই খোলা আকাশের নিচে নামাজ আদায় করতেন তারা। প্রায় ৪০ বছর তারা খোলা আকাশের নিচে নামাজ আদায় করেন। নির্মাণকাজের শেষের দিকে কারিগরদের প্রধান নেয়াজ অরফে কালুয়া মিস্ত্রি মহারাজার দরবারে গিয়ে সব মিস্ত্রিদের থাকা ও ধর্ম পালনের নিমিত্তে একটি মসজিদ নির্মাণের জায়গা চান।

তার এ আবেদনের রাজি হয়ে মহারাজা মন্দির থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ঢেপা নদীর পশ্চিম কোল ঘেষে অবস্থিত নয়াবাদ গ্রামে এক দশমিক ১৫ বিঘা জমিতে মসজিদ নির্মাণের জন্য জায়গা দেন। এছাড়া মসজিদের পাশে থাকার জন্য বাড়ি করারও নির্দেশ দেন রাজা।

মহারাজার নির্দেশ মোতাবেক মিস্ত্রিরা মন্দিরের পাশাপাশি নয়াবাদ গ্রামে নিজেদের থাকার বাড়ি ও মসজিদের নির্মাণকাজ চালিয়ে যান।

মন্দির ও মসজিদের কাজ চলমান থাকা অবস্থায় রাজা প্রাণনাথের মৃত্যুর পর তারই দত্তক নেয়া ছেলে মহারাজা রামনাথের আমলে ১৭১৫ সালে মন্দিরের নির্মাণকাজ শেষ হয়। আর মিস্ত্রিরা মসজিদের কাজ পুরোপুরি শেষ করেন ১৭২২ সালে।

নির্মাণকাজ শেষে কালুয়া মিস্ত্রির নেতৃত্বে আসা মিস্ত্রিরা ফিরে যান নিজ দেশে। কিন্তু এদেশ ছেড়ে যেতে চাননি নেয়াজ ওরফে কালুয়া মিস্ত্রি ও তার ছোট ভাই।

আবার নেয়াজ মিস্ত্রি মহারাজার দরবারে হাজির হন। এবার স্থায়ীভাবে বসবাস ও জীবিকা নির্বাহের জন্য মহারাজার কাছে কিছু জমির আবদার করেন। রাজা কিছু জমি তাদের দুই ভাইকে দান করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মিসরীয় দুই ভাই ফসল আবাদ করে দিনাতিপাত করেন।

মৃত্যুর পর কালুয়া মিস্ত্রি ও তার ছোট ভাইকে নয়াবাদ মসজিদ সংলগ্ন স্থানে দাফন করা হয়। তাদের নামানুসারে এ এলাকার নাম হয় নয়াবাদ মিস্ত্রিপাড়া। বর্তমানে মিস্ত্রি ও তার ছোট ভাইয়ের বংশধররা নয়াবাদ মিস্ত্রিপাড়ায় বসবাস করছেন।

জানা যায়, নয়াবাদ মসজিদটিতে একটি করে জানালা রয়েছে। দরজা-জানলার খিলান একাধিক খাঁজযুক্ত। যার ভেতরে পশ্চিমাংশে আছে তিনটি মেহরাব। মাঝের মেহরাবের তুলনায় দু’পাশেরগুলো একটু ছোট। মাঝের মেহরাবের উচ্চতা দুই দশমিক ৩০ মিটার ও প্রস্থ এক দশমিক আট মিটার।

মসজিদজুড়ে আয়তাকার বহু পোড়ামাটির ফলক রয়েছে। পোড়ামাটির নকশাগুলো বহু জায়গায় খুলে পড়েছে। ফলকগুলোর আয়তন দশমিক ৪০ মিটার দশমিক ৩০ মিটার। এগুলোর মধ্যে লতাপাতা ও ফুলের নকশা রয়েছে। এরূপ মোট ১০৪টি আয়তাকার ফলক রয়েছে। তবে ফলকের মধ্যে অলংকরণ অনেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত।

আয়তাকার মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট। এর চারকোণায় রয়েছে চারটি অষ্টভূজাকৃতির টাওয়ার। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৪৫ মিটার ও প্রস্থ পাঁচ দশমিক পাঁচ মিটার। দেয়ালের প্রশস্ততা এক দশমিক ১০ মিটার।

মসজিদে প্রবেশের জন্য পূর্বদিকে রয়েছে তিনটি খিলান। মাঝের খিলানের উচ্চতা এক দশমিক ৯৫ মিটার, প্রস্থ এক দশমিক ১৫ মিটার। পাশের খিলানদ্বয় সম-মাপের ও অপেক্ষাকৃত ছোট।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর নয়াবাদ মসজিদের অনেকাংশ সংস্কার করে চারপাশ ঘিরে দেয়াল দিয়েছে। মসজিদ এলাকায় পর্যটকদের জন্য করা হয়েছে চলাচল ও বসার ব্যবস্থা। সংযোগ দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ লাইন ও স্থাপন করা হয়েছে সোলার সিস্টেমও।

নেয়াজ অরফে কালুয়া মিস্ত্রির বংশধর ও নয়াবাদ মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল মান্নান জাগো নিউজকে জানান, এলাকার ও আশপাশের সবচেয়ে প্রাচীনতম মসজিদ এটি। প্রাচীন সব ইতিহাসের স্মৃতি বহনকারী নয়াবাদ মসজিদ এখন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে দেশজুড়ে।

বছরজুড়ে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক দেখতে আসেন মসজিদের প্রাচীন ইতিহাস। যারা কান্তজির মন্দির দেখতে আসেন, তারা নয়াবাদ মসজিদটিও দেখে যান।

শুক্রবার দূর-দূরান্ত থেকে মুসুল্লিরা নামাজ পড়তে আসেন এখানে। মসজিদের ভেতরে দুটি কাতারে ১০০ জন নামাজ আদায় করতে পারেন। বর্তমানে পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়দার করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক রয়েছে পুলিশের টহল দল।

নয়াবাদ মসজিদের খতিব হাফেজ মো. জাহিদ হাসান জাগো নিউজকে জানান, প্রাচীন নয়াবাদ মসজিদ এ অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। ৮১ শতক জমির ওপর নির্মিত মসজিদটি ১৯৬৮ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আওতায় যায়।

১৯৮৬-৯০ সালের মাঝামাঝি মসজিদটি প্রথম সংস্কার করা হয়। দ্বিতীয় সংস্কার করা হয় ২০০৭ সালে, তৃতীয়বার করা হয় ২০১৩ সালে। সর্বশেষ সংস্কার করা হয়েছে ২০১৯ সালে। সব মিলিয়ে মসজিদের ৬০ ভাগ সংস্কার হয়েছে। করোনা মহামারি না থাকলে হয়তো শতভাগ কাজ শেষ হতো।

যেভাবে যেতে হবে : কান্তজিউ মন্দির সংলগ্ন নয়াবাদ মসজিদ অবস্থিত। এখানে রাজধানী ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন ও প্লেনে করে যাতায়াত করা যায়।

থাকা ও খাওয়া : মসজিদ সংলগ্ন কান্তনগর এলাকায় একটি সরকারি রেস্ট হাউজ ও পর্যটন মোটেলের একটি শাখা রয়েছে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক হোটেলগুলোতে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আর খাবারের জন্য মসজিদ এলাকার আশপাশে ছোট-বড় বিভিন্ন মানের হোটেল গড়ে উঠেছে।