তবুও বলছি,প্রধানমন্ত্রীর একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয়

Thursday, October 17th, 2019

বিশেষ প্রতিবেদক::  সুলতানা কামাল। মানবাধিকার নেত্রী। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। মানবাধিকার ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে।

দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখোমুখি হন সাংবাদিকের। দীর্ঘ আলোচনায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ড, উন্নয়ন ও রাজনীতির বিভিন্ন প্রসঙ্গ উঠে আসে। অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নে মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হতে পারে বলেও মত দেন।

আজ বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়েই আওয়ামী লীগ রাজনীতি করছে। অথচ তারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদাসীন

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানে কাঁচামাল সরবরাহের যেমন ক্ষেত্র বানিয়েছিল, এখন ভারতও তেমন একটি ক্ষেত্র বানাতে চাইছে বাংলাদেশকে।’ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের (ভারত) আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, ভারত বাংলাদেশকে ময়লার ভাগাড় বানাতে চাইছে কি-না? তারা বাংলাদেশকে কলকারখানার ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলল কি-না?’

‘সর্বক্ষেত্রেই আমরা অনেক বেশি ছাড় দিচ্ছি ভারতকে’- এমন মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘যে ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করল আমি ব্যক্তিগতভাবে সে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
সাংবাদিক : আগের পর্বে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চেয়েছেন। আমলা-পুলিশের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ। এমন প্রশাসন দিয়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান…

সুলতানা কামাল : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত শক্তিশালী একজন মানুষ। আন্তর্জাতিকভাবেও। তবুও বলছি, একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। এখানে সবার আগে তার দলের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এমপি-মন্ত্রীরা যদি শেখ হাসিনার হাত সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, তাহলে অবশ্যই আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

ফের পিছিয়ে গেলে রাষ্ট্রপরিচালনকারীরা ইতিহাসে ধিকৃত হবেন। আমরা সেই ধিক্কার নেব কেন

রাজনীতিবিদরা স্বচ্ছ থাকলে প্রশাসনও স্বচ্ছ থাকতে বাধ্য হবে। শুরু করতে হবে রাজনীতিবিদদেরই।

সাংবাদিক : দুর্নীতির মাত্রা শিক্ষিতজনের ক্ষেত্রেই অধিক। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের কেলেঙ্কারিতে সেটাই বেরিয়ে আসছে…

সুলতানা কামাল : এই শিক্ষিতরা হচ্ছেন সুবিধাভোগী। কোনো না কোনোভাবে প্রধানমন্ত্রীকে ভালো দিকটা দেখিয়ে এসব জায়গায় অবস্থান করছেন।

ফের আমরা মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতিতে পড়ে গেছি। যেখানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে

আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিনের একটি পরীক্ষিত দল। দলটি বারবার দেশপ্রেমের সাক্ষর রেখেছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সাধারণ মানুষও গেছে ভালো কাজের সময়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু যুদ্ধ করেছে গ্রামের কৃষকরা।

বঙ্গবন্ধুর মতো শেখ হাসিনাও সুযোগ পেয়েছেন সাধারণ মানুষকে কাছে টানার। সাধারণ মানুষ এখনও তাকে বিশ্বাস করে। দলের লোকেরা যদি শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করে, তাহলে এখনও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। শেখ হাসিনা শেষ সুযোগ হিসেবে এটি গ্রহণ করতে পারেন।

সাংবাদিক : এক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কোনো হতাশা বা বিভেদ লক্ষ্য করছেন কি-না?

সুলতানা কামাল : মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু তরুণরা ভালোর সঙ্গেই থাকার পক্ষে। আমরা সামাজিক অভিভাবকদের দেখে বড় হয়েছি, দেশপ্রেম শিখেছি। নইলে ২১ বছর বয়সে সীমান্ত পার হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বা সহায়তা করার কথা নয়। সেই চেতনা ফেরত আনতে হবে।

দলের লোকেরা যদি শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করে, তাহলে এখনও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস
সাংবাদিক : কারা আনবে? সুশীল অভিভাবকরাও তো বিভাজিত…

সুলতানা কামাল : নাগরিকরা এখন উঠে দাঁড়াক। তারাও আবরার হত্যার নিন্দা করুক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুক। অপরাধীর শাস্তির দাবি করুক। সংশোধিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা আমাদের সবার দায়িত্ব।

আমার মনে হচ্ছে, ফের আমরা মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতিতে পড়ে গেছি। যেখানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে।

সাংবাদিক : যদি এ লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া না যায়…

রাজনীতিবিদরা স্বচ্ছ থাকলে প্রশাসনও স্বচ্ছ থাকতে বাধ্য। শুরু করতে হবে রাজনীতিবিদদেরই

সুলতানা কামাল : বহু বছর পিছিয়ে যাব আমরা। হয়তো ধ্বংস হব না। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর যেমন কয়েক’শ বছর পিছিয়ে গেলাম, ঠিক তেমন করেই ফের পিছিয়ে যাব।

ফের পিছিয়ে গেলে রাষ্ট্রপরিচালনকারীরা ইতিহাসে ধিকৃত হবেন। আমরা সেই ধিক্কার নেব কেন? উপলব্ধিটা এখনই হোক। এখানে দায়িত্বশীল হতে হবে রাজনীতিবিদদের এবং প্রধানমন্ত্রী নিজেকেও। প্রধানমন্ত্রী লোক দেখানোর জন্য কাজ করছেন- এমন অবিশ্বাস যেন মানুষের মনে না জন্মে।

সাংবাদিক : এমন অস্থির সময়ে অন্য কোনো শক্তি…

সুলতানা কামাল : ১/১১- এর প্রেক্ষাপট ধরে যদি বলি, অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসলেও জনগণ কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানেনি। মাইনাস টু ফর্মুলায় জনগণের সমর্থন ছিল না বলে বাস্তবায়ন হয়নি। নির্বাচন দিতে হয়েছে। সাংবিধানিক ধারা ফেরত এসেছে।

জনগণের এমন মতামত রাজনীতিবিদরাও ভুলে যান। দুঃখ এখানেই। অথচ তাদের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ থেকে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করার কথা ছিল। নাগরিক অধিকার, স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার কথা।

২০২০ সাল মুজিববর্ষ ঘোষণা করা হলো। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। যদি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে এসব দিবসের মর্যাদা কোথায়?

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়। এরপর বলেছিলেন, বাংলার মানুষ রাজনৈতিক মুক্তি চায়, সামাজিক মুক্তি চায়, অর্থনৈতিক মুক্তি চায় এবং সাংস্কৃতিক মুক্তি চায়। মানবাধিকারের বিষয়গুলোর সবই ৭ মার্চের ভাষণে রয়েছে।

আজ বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়েই আওয়ামী লীগ রাজনীতি করছে। অথচ তারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদাসীন। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী একটা সুযোগ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন, যেখানে তার দল অগ্নিপরীক্ষায় অংশ নিক।