শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজের ভাগাড় সরছে

Friday, January 24th, 2020

জুয়েল কবির শাহিন,বিশেষ প্রতিবেদক::  হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের দিকে যেতেই কার্গো কমপ্লেক্সের পাশে চোখে পড়বে কয়েকটি পুরনো উড়োজাহাজ। এর বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের। এ ছাড়া আছে বর্তমানে অপারেশনে থাকা রিজেন্ট এয়ারওয়েজসহ আরো কয়েকটি কম্পানির প্রায় ২২টির মতো উড়োজাহাজ। বছরের পর বছর ধরে উড়োজাহাজগুলো পড়ে থাকলেও তা সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। দেশের প্রধান বিমানবন্দরটির সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজের এ ভাগাড় নিজ উদ্যোগে সরিয়ে ফেলতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে বারবার তাগাদা দিয়েও কোনো ফল না পাওয়ায় খুব শিগগির এ ভাগাড় পরিষ্কার করা হবে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র।

বিমানবন্দরে উড়োজাহাজগুলো ডাম্পিং জোনের মতো ফেলে রাখায় কার্গো ভিলেজ অ্যাপ্রোনের বিশাল অংশ দখল হয়ে আছে। এতে সেখানকার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে উড়োজাহাজগুলো থেকে বকেয়া পার্কিং চার্জও আদায় করতে পারছে না বেবিচক। অথচ কার্গো ভিলেজ অ্যাপ্রোন থেকে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে নিলে সেখানে কমপক্ষে সাতটি উড়োজাহাজ পার্কিং করা যেত বলে দাবি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের। সেই সঙ্গে কার্গো উড়োজাহাজগুলোতে মালামাল ওঠানো ও নামানো সহজ হতো।

জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের জায়গা খালি করতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

সূত্র জানায়, ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ ২০১২ সালের ৩০ মার্চ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ধরনের রুটে ফ্লাইট কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বেসরকারি এয়ারলাইনস জিএমজি। কার্যক্রম বন্ধের সাত বছর পার হলেও শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে পরিত্যক্ত দুটি এমডি-৮২ উড়োজাহাজ সরিয়ে নেয়নি এয়ারলাইনসটি।

শাহজালাল বিমানবন্দর সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ অ্যাপ্রোনে ২০১২ সালের মার্চে পরিত্যক্ত দুটি এমডি-৮২ (রেজিস্ট্রেশন নং-এস২এডিও, এস২এডিএম) ও দুটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ ফেলে রাখা হয়। পরে ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ দুটি বিক্রি করে দিলেও এখনো সরিয়ে নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া কার্গো পরিবহনে ব্যবহৃত স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইনসের একটি ট্রাইস্টার (রেজিস্ট্রেশন নং-এস২এইটি) উড়োজাহাজ ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। একইভাবে অ্যাভিয়েনা এয়ারলাইনসের একটি ড্যাশ-৮ (রেজিস্ট্রেশন নং-এস২এইএল) এবং বিসমিল্লাহ এয়ারলাইনসের একটি ড্যাশ-৮ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। আছে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ১০টি এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি ড্যাশ উড়োজাহাজ।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক তৌহিদ-উল-আহসান বলেন, ‘আমাদের থার্ড টার্মিনালের জন্য বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ হচ্ছে। এগুলো রাখলে অনেক জায়গা নষ্ট হচ্ছে। এগুলো সরিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া চলছে। শিগগিরই এটি হবে বলে আশা করছি।’

বেবিচক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে এসব উড়োজাহাজ বিমানবন্দরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এগুলো সরিয়ে নিতে এয়ারলাইনসগুলোকে একাধিকবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে নিতে সময় চেয়ে আবেদন করেছে। কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ায় যারা যোগাযোগ করছে না, নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের উড়োজাহাজগুলো স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বেবিচক।

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ম্যানেজার (পিআর) ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ১০টি উড়োজাহাজ শাহজালালে পড়ে আছে। আমাদের সব উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ পেন্ডিং আছে। অর্থ সংকটের কারণে তা করা যায়নি। উচ্চ আদালতে একটি মামলা চলছে। তা ছাড়া আমাদের কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করছে, অর্থ জোগাড় হলে আমরা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’

জানতে চাইলে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আসিফ বলেন, ‘শাহজালালে আমাদের একটি বোয়িং ও দুটি ড্যাশ নিয়ে মোট তিনটি উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের অপেক্ষায় আছে।’ তিনি জানান, বোয়িংটির ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তবে ড্যাশ উড়োজাহাজ দুটি খুব শিগগির রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে না।

এর কারণ জানতে চাইলে রিজেন্টের সিইও বলেন, ‘২০১০ সালে ড্যাশ-কিউ-৩০০ মডেলের উড়োজাহাজ দুটি আমরা যখন কিনি, তখন এর উৎপাদক ছিল বোম্বাডিয়ার। ছয় মাস আগে এটি কানাডার কম্পানি ডিহ্যাভিল্যান্ডের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। এ কারণে এর খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে এখন ডিহ্যাভিল্যান্ড আবার পার্টস সাপোর্ট দেওয়া শুরু করছে। এ কারণে আমরা আশা করছি, সময় লাগলেও এ দুটি আবার সক্রিয় করা যাবে।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক উইং কমান্ডার তৌহিদ জানান, পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে নিলে সেখানে কমপক্ষে সাতটি উড়োজাহাজ পার্কিং করা যাবে। পাশাপাশি কার্গোগুলোতে মালামাল ওঠানো ও নামানো সহজ হবে।

এদিকে উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে না নেওয়ায় এয়ারলাইনসগুলোর পার্কিং বাবদ চার্জ প্রতিনিয়ত বকেয়া হিসেবে বাড়ছে। কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া এয়ারলাইনসগুলো থেকে এ অর্থ আদায়ও করতে পারছে না বেবিচক। জানা যায়, চালু থাকা এয়ারলাইনসগুলোও বকেয়া পরিশোধ করছে না। গত জুন পর্যন্ত অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ বাবদ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে এক হাজার ৪৪৭ কোটি এবং ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে সব মিলে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বেবিচকের।