পাল্টে যাচ্ছে বরিশালের মানচিত্র

Sunday, July 7th, 2019


স্টাফ রিপোর্টার :
এক সময় যাদের গোয়াল ভরা গরু, শষ্যে ভরা ক্ষেতে আর পুকুর ভরা মাছ ছিলো। তারাই এখন নদী ভাঙ্গনে স্বর্বশান্ত হয়ে ঠাঁই নিয়েছেন রাজধানী ঢাকা শহর অথবা বিভাগীয় কোন বড় শহরের বস্তিতে। বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলের কোটি মানুষের সারা বছর ভালো কাটলেও বর্ষাকাল আসলেই নদী ভাঙ্গন নিয়ে উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। ঝড়-জলোচ্ছ¡াসের পাশাপাশি নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে প্রতি বছর এ অঞ্চলের লাখ লাখ পরিবার গৃহহীন হচ্ছে, প্রাণহানী ও নিখোঁজের ঘটনাও রয়েছে অসংখ্য। ভূমিহীন এসব পরিবারগুলো বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নেয়া ছাড়াও জীবন-জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছে ঢাকা কিংবা বড় কোন বিভাগীয় শহরগুলোতে। তাদের কাছে উপকূলে বসবাস করা মানেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে জীবনযুদ্ধে সামিল হওয়া।
বিশেষ এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে দÿিণাঞ্চলে অব্যাহত নদী ভাঙ্গনের ফলে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম। যেকারনে ক্রমেই বরিশালসহ গোটা দÿিণাঞ্চলের স্থল ভাগের মানচিত্র ছোট হয়ে পাল্টে যাচ্ছে। আর এখনও দÿিণাঞ্চলের ভয়ঙ্কর ১৫টি নদীর সাথে যুদ্ধ করে কোন মতে বেঁচে আছের নদীর তীরবর্তী কোটি মানুষ। নদী ভাঙ্গনের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের ১৫টি নদীর কড়াল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম। গৃহহারা হয়েছে কয়েক লাখ পরিবার। গ্রাম্য প্রবাদ মতে, “ঘর পুড়লে ভিটেমাটি টুকু থাকে কিন্তু নদী ভাঙ্গনে কিছুই থাকে না”। এমনকি পূর্ব পুরুষের কবর জিয়ারতের সুযোগটি পর্যন্ত পায়না ভাঙ্গন কবলিত মানুষেরা। বাড়ি-ঘরের সাথে গাছপালা আর পারিবারিক গোরস্থানও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
খোঁদ বরিশাল নগরী সংলগ্ন চরবাড়িয়া, চরমোনাই, চরকাউয়া, চরআইচা ও চরবদনার অব্যাহত ভাঙ্গনে ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যক মসজিদ, স্কুল, ইটেরভাটাসহ কয়েক হাজার ঘরবাড়ি কীর্তনখোলা নদী গ্রাস করে নিয়েছে। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙ্গনে শায়ে¯Íাবাদ ইউনিয়নের কালিগঞ্জ, রাজাপুর ও আটহাজার নামের তিনটি গ্রাম বহুআগেই বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রামের এখন আর কোনো অ¯িÍত্ব পর্যন্ত নেই। মেহেন্দিগঞ্জের ভাষানচর, বাগরজা, শিন্নিরচর নদী ভাঙ্গনের কবলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। উলানিয়া গ্রামটি এখন মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হওয়ার পথে। সেখানকার কালিরবাজার নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পর এখন উলানিয়া মিয়া বাড়ি ও বড় বাজার হুমকির মুখে পড়েছে। উলানিয়াকে রÿায় পরীÿামূলক ভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রায় এক কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ করা হলেও উলানিয়াকে রÿায় তা কতোটা ভূমিকা রাখতে পারবে তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সূত্রমতে, মেঘনার কড়াল গ্রাসে উলানিয়ার অদূরবর্তী ভোলার বঙ্গেরচর, রাজাপুর, দৌলতখান, গুপ্তের বাজার, সৈয়দপুর, ভবানীপুর, এমনকি খোঁদ ভোলা শহরের নিকটবর্তী ধনিয়া, কাঁচিয়া এখন বিলীন হওয়ার পথে। ভোলা শহর থেকে মেঘনার দূরত্ব এখন মাত্র ৫ কিলোমিটার। ভোলা শহর রÿায় কাঁচিয়ায় একের পর এক বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ভাঙ্গন প্রতিরোধে বøক ফেলে মেঘনাকে শাসন করার চেষ্টা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। নদী প্রতিশোধ নিতে নাসির মাঝি এলাকায় ফনা তুলেছে। তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনে বোরহানউদ্দিনের কাঁচিয়া, পÿিয়া, হাকিমউদ্দিন ও পদ্মা মনষা গ্রাম পড়েছে ঝুঁকির মুখে। বোরহানউদ্দিনের শাহবাজপুরের গ্যাস ফিল্ডের কাছাকাছি চলে এসেছে নদীর ভাঙ্গন। ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী আলিমাবাদ ইউনিয়ন কালাবদর নদীর স্রোতে বিলীন হওয়ার পথে। পার্শ্ববর্তী চাঁদপুরা ইউনিয়নটি রয়েছে চরম হুমকির মুখে। মেঘনার ভাঙ্গনে পুরান হিজলা, চর মেমানিয়া, মৌলভীরহাট, গঙ্গাপুর, হরিনাথপুর, মলিøকপুর, বাউশিয়া, বাহেরচর, হিজলা-গৌরবদী ও পালপাড়া গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, ১০টি স্কুল এবং তিনটি হাটবাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
মুলাদীর জয়ন্তী ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙ্গনে উপজেলার নন্দিবাজার, চরল²ীপুর, পাতারচর, বানিমদন, নাজিরপুর, মৃধারহাট, ছবিপুর, গুলিঘাট ও বাটামারা গ্রামের ২ হাজার বাড়িঘর, ৫টি বাজার ও ১০টি শিÿা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মুলাদী থেকে গৌরনদী যাতায়াতের সড়কটি বিলীন হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ১০ বছরেও তা সংস্কার করা হয়নি। সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে বানারীপাড়া-স্বরূপকাঠী সড়কটি ৬ বছরে আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যদিও এখন সেখানে বিকল্প সড়ক তৈরী করা হয়েছে। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে রাজগুরু, লোহালিয়া, ÿুদ্রকাঠী, বাহেরচর, ঘোষকাঠী, মহিষাদি, রাকুদিয়া, ছানি কেদারপুর, মোলøারহাট, রহিমগঞ্জ, রফিয়াদি গ্রামের কয়েক হাজার বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে উপজেলা সদর ও মীরগঞ্জ বাজার থেকে সুগন্ধা নদীর দূরত্ব মাত্র ১’শ গজ। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৫টিই নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। চরম হুমকির মুখে রয়েছে শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর জাদুঘর।
উজিরপুরে সন্ধ্যা ও সুগন্ধা নদীর ভাঙ্গনে বরাকোঠা ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম ও শিকারপুরের ১০টি গ্রাম এবং গুঠিয়া ইউনিয়নের দাসেরহাট, কমলাপুর, সাকরাল, পরমানন্দ গ্রামের ২০ হাজার ঘরবাড়ি ও ৫টি স্কুল-মাদ্রাসা নদীতে বিলীন হয়েছে। ওই উপজেলার সাকরাল গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। শিকারপুর ও শেরেবাংলা ডিগ্রি কলেজ বর্তমানে সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে বানারীপাড়া উপজেলার কাজলাহাট, জম্বুদ্বীপ, ব্রা²নকাঠী, নাজিরপুর, শিয়ালকাঠী, মসজিদবাড়ির ১৫ হাজার ঘরবাড়ি, ৭টি স্কুল-মাদ্রাসা ও ২টি বাজার ইতিপূর্বে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শিয়ালকাঠী, দান্ডয়াট ও নলশ্রি গ্রাম এখন বিলীনের পথে। উজিরপুরের সাকরাল গ্রামের করিম সিকদারের পুত্র মিজান জানান, সে কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। একরাতে তার ফসলের জমি বসত ঘর নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়। সে এখন শ্বশুর বাড়িতে বসবাস করে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে কোনমতে দিন কাটাচ্ছেন। তার ভাই হাবিবুর রহমানেরও একই অবস্থা। ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের আসলেই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়। তাই গত কয়েকদিনের ভাড়ি বর্ষণে রাÿুসী নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ভাড়ি বর্ষণে উজিরপুর-সাতলা সড়কটি এখন হুমকির মুখে। ইতোমধ্যে সাকরাল বহুমূখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনের অংশ ভেঙ্গে পড়েছে, পাশের মসজিদটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গত বছর বরাকোঠা ইউনিয়নের প্রায় দেড় হাজার পরিবার নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ত্র হারিয়ে পথে বসেছেন। দীর্ঘদিনেও তাদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেননি। ওই এলাকার চৌধুরীরহাট বাজারের প্রায় ৫০টি দোকান ঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় জমির অ¯িÍত্বের সংকটে বাজারটি এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দাসেরহাট, হক সাহেবের হাট, কমলাপুর, শিকারপুর এলাকার সহস্রাধীক পরিবার ভাঙ্গন আতঙ্কে রয়েছেন। উজিরপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বাদল জানান, গত বছর বরিশাল জেলা প্রশাসকের জি.আর তহবিল থেকে ৬৫০টি পরিবারের মাঝে কিছু চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ভাঙ্গনের কবলে পরে সর্বশান্ত প্রায় এক হাজার পরিবারের ভাগ্যে আজো কোনো সাহায্য সহযোগীতা জোটেনি।
আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট নদীর ভাঙ্গনে খাজুরিয়া, বাগধা, চাত্রিশিরা, আমবৌলা ও সাতলা গ্রামের কয়েক’শ ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। বর্তমানে পয়সারহাট নদীর ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। গৌরনদীর পালরদী নদীর ভাঙ্গনে উপজেলার হোসনাবাদ ও মিয়ারচর গ্রামের বাড়িঘর প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে। এখনো অসংখ্য বাড়িঘর, স্কুল ও বাজার ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। বাকেরগঞ্জের তুলাতলা, তান্ডব, খয়রাবাদ, বেবাজ, কাতিভাঙ্গা, রাঙ্গামাটি তুলাতলী নদীর ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। ওই নদীর কড়াল গ্রাসে এখন হুমকির মুখে রয়েছে কলসকাঠী, বোয়ালিয়া, বাখরকাঠী, নীলগঞ্জ, চরামদ্দি এলাকার কয়েক হাজার বাড়িঘর।
মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা, তেঁতুলিয়া, মাছকাটা, লতা ও আইরখালী নদীর ভাঙ্গনে উপজেলা সদর, গৌবিন্দপুর, উলানিয়া, চাঁনপুর, আলিমাবাদ, চর গোপালপুর, ভাষানচর, দরিররচর-খাজুরিয়া, চরএকরিয়া এলাকার কয়েক হাজার বাড়িঘর, অর্ধশতাধিক স্কুলসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গোবিন্দপুরের ৯টি গ্রামের মধ্যে বর্তমানে মাত্র একটি গ্রাম রয়েছে। ওই একটি গ্রামকে পুনরায় ৯টি গ্রামে বিভক্ত করা হয়েছে। তাও ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। প্রতিবছর নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও নামেমাত্র কাজ করে সিংহভাগ টাকাই ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের পকেটে চলে যায় বলে ভাঙ্গন কবলিতরা অভিযোগ করেন। ভাঙ্গন প্রতিরোধে কখনোই কার্যকরী কোনো পদÿেপ গ্রহণ করা হয়নি। ভাঙ্গন কবলিত এলাকার মানুষেরা জানান, স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত যে পরিমাণ টাকা নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সে টাকায় ভাঙ্গন কবলিত গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষদের পুর্ণবাসন করা সম্ভব হতো। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে ২/১ কিলোমিটার দূরে গিয়ে নতুন কোনো বেড়িবাঁধে বসতি গড়ে ভাঙ্গন কবলিত মানুষেরা। কিন্তু দেখা যায় ২/১ বছরের মধ্যেই আবার সেখানেও নদী আঘাত হানে। এ যেন ছোঁয়াচে রোগের মতোই। এভাবে একের পর এক ভাঙ্গনের শিকার হয়ে অসহায় মানুষ গ্রাম ছেড়ে রুটি-রুজির সন্ধানে পাড়ি জমায় ঢাকা কিংবা বিভাগীয় কোনো বড় শহরে। এদের ঠাঁই হয় ব¯িÍতে। কেউ রিকসা চালিয়ে কিংবা ঠেলাগাড়ি ঠেলে আবার গৃহবধূরা জীবিকার সন্ধানে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালায়। একসময় যাদের গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ আর শস্যে ভরা মাঠ ছিলো তারাই নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে এখন নগর জীবনে হতদরিদ্র মানুষের তালিকাভূক্ত হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি হিসেব মতে সারাদেশে দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করে ৪০ শতাংশ মানুষ। অথচ নদী ভাঙ্গনের শিকার ও ঝড়-জলোচ্ছ¡াসসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়া দÿিণাঞ্চলীয় বিভাগ বরিশালে দারিদ্র্যের হার ৫৩ ভাগ। এ বছর বর্ষা মৌসুম শুরু হতে না হতেই বিরূপ আবহাওয়ার কারনে পানি বৃদ্ধি ও সাগরে নিম্নচাপের কারণে নদীর তীরবর্তী জনসাধারনের মাঝে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নদী তীরের বাসিন্দারা জানান, পানি নামতে শুরু করলে ভাঙ্গন ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। আবারো শত শত বাড়িঘর ও গ্রাম বিলীন হবে দÿিণের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৫টি নদীর কড়াল গ্রাসে।
হিজলায় মানুষের স্থায়ী দুঃখ নদী ভাঙ্গন \ মেঘনা তীরের হিজলা অবহেলিত জনপদ। চারদিকে শুধু নদী আর নদী। নদী ও প্রকৃতির সাথে এখানের মানুষজন সুদীর্ঘকাল ধরে লড়াই করে আসছেন। হিজলার মানুষের স্থায়ী দুঃখ নদী ভাঙ্গন। নদী ভাঙ্গলে তারা কাঁদে, আবার এই নদীর মাছের ওপরই হিজলার প্রায় ৪০ ভাগ মানুষের বাঁচা-মরার সংগ্রাম। বিশেষ করে জেলেরা মেঘনায় ইলিশ মাছ পেলে তাদের আহার জোটে। জালে মাছ না পড়লে অনাহারেই তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হয়। হিজলার মেঘনা তীরে প্রতি বছর গ্রামের পর গ্রাম, শিÿা প্রতিষ্ঠান, বাজার, ফসলী জমি প্রমত্তা মেঘনার অতল তলে হারিয়ে যাচ্ছে। ঘরবাড়ি, বৃÿ, গবাদী পশুসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ হারিয়ে ভাঙ্গণ কবলিত হাজার-হাজার মানুষেরা এখন সর্বশান্ত। ওই উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ আজো আশ্রয়হীন হয়ে খোলা আকাশের নীচে বসবাস করছেন। ভাঙ্গন কবলিত পরিবারগুলোর সহস্রাধীক মানুষদের আশ্রয় মিলেছে বেড়িবাঁধে। হিজলা উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন রাÿুসী মেঘনা ও একটি ইউনিয়নকে নয়াভাঙ্গনী নদী ঘিরে রেখেছে। ইতোমধ্যে বড়জালীয়া, হিজলা গৌরবদী, হরিনাথপুর ও ধুলখোলা ইউনিয়নের একটি বড় অংশ নদীতে গিলে ফেলেছে। অন্যান্য এলাকাগুলোতেও আঘাত হেনেছে প্রমত্তা মেঘনা। গত বছর হরিনাথপূর ইউনিয়নের টুমচর ও মহিষখালী গ্রাম নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। এবছর জব্বার মেহমান কলেজ, বদর টুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মহিষখালী মাদ্রাসা, পুলিশ ক্যাম্প ও পুরান হিজলা বাজার হুমকির মুখে রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে নদী ভাঙ্গনের কারনে এসব এলাকার বহু শিÿা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, হাজার-হাজার ঘরবাড়ি, ফসলী জমি এখন পানির অতল তলে হারিয়ে গেছে। কয়েকবছর পূর্বে হিজলা থানাটিও ভাঙ্গণের মুখে পরায় তা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নদী ভাঙ্গণের মুখে পরে আশ্রয়হীন অসংখ্য পরিবার বরিশাল শহরের কাশিপুর, কাউনিয়া, সাগরদীসহ বিভিন্নস্থানে এবং বাকিদের একটা বড় অংশ ভোলার চরফ্যাশন ও বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। এদেরমধ্যে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা মজিবর রহমান সরোয়ারের পিতা কাউনিয়ায়, মোঃ আলী হোসেন ও নজরুল ইসলাম মিলন কাশীপুরে আশ্রয় নিয়েছেন। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন তিনি আগে নদী ভাঙ্গনের কবলে পরে কাশীপুরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি রংপুরে স্থায়ী বসবাস করছেন।
পায়রা নদীতে ফের ভাঙ্গন শুরু \ নতুন করে ফের পায়রা নদীর ভাঙ্গণ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক’শ একর কৃষি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পৌর শহর রÿা বাঁধের বøক সরে যাচ্ছে। বড় ধরনের হুমকীর মুখে পরেছে পৌরসভাসহ বরগুনার আমতলী-তালতলী উপজেলার ২০টি গ্রাম। নতুন করে ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ভাঙ্গন কবলিত এলাকার মানুষেরা। পায়রা নদীর তীব্র ভাঙ্গনে ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে আমতলী ও তালতলীর মানচিত্র। সূত্রমতে, ১৯৯০ সালে আমতলী ও তালতলী উপজেলায় পায়রা নদীর ভাঙ্গন শুরু হয়। এ পর্যন্ত ভাঙ্গনের ফলে পৌরসভার পুরাতন শ্মশান ঘাট, লঞ্চ ঘাট, ফেরিঘাট, বালিয়াতলী, পশুরবুনিয়া, পশ্চিম ঘটখালী, আঙ্গুগুলকাটা, গুলিশাখালী, জয়ালভাঙ্গা, বগীরবাজার, মৌপাড়া, গাবতলী, তেতুঁলবাড়িয়া ও তালুকদারপাড়াসহ ২০টি গ্রামের অর্ধেক অংশ নদী গ্রাস করে নিয়েছে। অন্যদিকে পাউবোর ভেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে লবন পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার ফসলী জমি ধ্বংস করছে। সূত্রে আরো জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে আমতলী পৌরসভাকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রÿায় ১ কিলোমিটারের দৈর্ঘ্য সিসি বøœক ফেলা হয়। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলাতে রÿাবাঁধের ব্যাপক ÿতি হয়। ২০১০ সালে মাত্র ১২৫ মিটার ÿতিগ্র¯Í অংশের বøক ফেলা হয়। ওইকাজ অতি নিম্নমানের হওয়ায় পুনঃরায় বøক সরে যাচ্ছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে পাউবোর অফিস সংলগ্ন পায়রা নদীতে ভয়াবহ ভাঙ্গনের কারণে ৫০/৬০ মিটার বøক সরে গেছে। বর্তমানে ফেরিঘাট, পুরাতন লঞ্চঘাট, পশ্চিম ঘটখালী, আঙুলকাটা এলাকা ঝুঁঁকির মধ্যে রয়েছে। গত ২৩ বছরে আমতলী ও তালতলী উপজেলায় ৪ হাজার ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ৮’শ একর কৃষি জমি ও ২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বরিশালসহ গোটা দÿিণাঞ্চলের নদী ভাঙ্গণরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ শুরু করা হবে।