মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন জয়ের দুয়ারে জো বাইডেন

Saturday, November 7th, 2020

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে বিশ্বকে তাক লাগানো জয় পেতে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। এতে রিপাবলিকান দলের প্রতীক হাতি পতনের মুখে।

জনতার রায়ে উত্থান হতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাট দলের প্রতীক গাধার। যদিও নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা কাজ করছে। নির্বাচনের তিন দিন পরও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোট গণনা চলছে।

ভোট নিয়ে মামলাও হচ্ছে। যদিও দুই রাজ্যে ট্রাম্প শিবিরের দায়ের করা মামলা ইতোমধ্যে খারিজ হয়ে গেছে। এখন সবার দৃষ্টি পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা ও নাভাদা অঙ্গরাজ্যের ফলাফলের দিকে।

এসব অঙ্গরাজ্যে এখনও ফলাফল স্পষ্ট হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত ফলাফল কখন আসবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ভোট গণনা হয়েছে ও ফল জানা গেছে তাতে জো বাইডেন অনেক এগিয়ে আছেন। বলতে গেলে তিনি জয়ের দুয়ারে পৌঁছে গেছেন।

সর্বশেষ প্রাপ্ত ভোটের হিসাব অনুযায়ী ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষায় থাকা পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা ও নেভাদা অঙ্গরাজ্যের প্রতিটিতে জয় পেতে যাচ্ছেন বাইডেন। আগেই অ্যারিজোনা ও নেভাদায় বাইডেন এগিয়ে ছিলেন।

বৃহস্পতিবার তিনি নতুন করে পেনসিলভানিয়া ও জর্জিয়ায় এগিয়ে যান। ভোটের ধরন অনুযায়ী, চারটি রাজ্যে জয়ী হয়ে বাইডেন ৩০৬টি ইলেকটোরাল ভোট দখলে নিতে যাচ্ছেন।

তবে এখন পর্যন্ত জো বাইডেনের প্রাপ্ত মোট ইলেকটোরাল ভোট ২৫৩টি। জয়ের জন্য মোট ২৭০টি ভোট প্রয়োজন। এদিকে নর্থ ক্যারোলিনায় ট্রাম্প জয় পেতে যাচ্ছেন। ধারণা করা হয়েছিল বাইডেনের ট্রাম্পকার্ড হবে নেভাদা।

কিন্তু সেই ট্রম্পকার্ড ছাড়াও এখন জয়ের সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে তার। ডাকযোগে আগাম ভোটের গণনার ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এ রাজ্যে ৮৯ শতাংশ গণনা শেষে এগিয়ে আছেন তিনি।

এখানে ইলেকটোরাল ভোট ৬টি। পেনসিলভানিয়ায় ৯৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষে বাইডেন এগিয়ে আছেন। এ রাজ্যে আরও তিন লাখের মতো ভোট গণনা বাকি রয়েছে। এর বেশির ভাগই ডেমোক্র্যাটদের ভোট।

পেনসিলভানিয়ায় বাইডেন জয়ী হলে এখানকার ২০টি ইলেকটোরাল ভোট তিনি পাবেন। এক্ষেত্রে অন্য কোনো অঙ্গরাজ্যে তার জয়ের প্রয়োজন হবে না। তবে ভোট গণনার ধারা অনুযায়ী অন্য তিনটি অঙ্গরাজ্যেও জয় পেতে যাচ্ছেন বাইডেন।

১৬টি ইলেকটোরাল ভোটের অঙ্গরাজ্য জর্জিয়ার ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে এগিয়ে রয়েছেন বাইডেন। এখানে আরও ৩০ হাজার ভোটের গণনা বাকি। ভোটগুলোর বেশির ভাগই ডেমোক্র্যাটদের।

অ্যারিজোনায় শুরু থেকে এগিয়ে ছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। ৯০ শতাংশ গণনা শেষে এখানে ব্যবধান কিছুটা কমলেও এগিয়ে আছেন বাইডেন। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও বিভিন্ন গণমাধ্যম ইতোমধ্যে অ্যারিজোনায় বাইডেনকে জয়ী ঘোষণা করেছে।

নর্থ ক্যারোলিনায় ৯৫ শতাংশ ভোট গণনায় এগিয়ে আছেন ট্রাম্প। ১৫ ইলেকটোরাল কলেজের এ রাজ্যে ট্রাম্পের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে এতে ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, এখনও পাঁচ রাজ্যে ঝুলছে ট্রাম্প ও বাইডেনের ভাগ্য। সার্বিক ফলাফলে বাইডেনের পালেই জয়ের মৃদু হাওয়া। পেনসিলভানিয়াতে ট্রাম্প জয়ের পথে এগিয়ে থাকলেও সময়ের সঙ্গে কমছে ব্যবধান।

অবশ্য নর্থ ক্যারোলিনায় শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এ রাজ্যে পাঁচ শতাংশ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন ট্রাম্প। ভোটের পর থেকেই ট্রাম্প দাবি করছেন, নির্বাচনের ফল তার কাছ থেকে চুরি করে নেয়া হচ্ছে।

যদিও তার এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারীর কারণে এ বছর ভোট গণনায় প্রচুর সময় লাগছে।

বিপুল পরিমাণ আগাম ভোটও একটি কারণ। অনেকেই বলছেন, ট্রাম্প যদি সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হন এবং আদালত যদি মামলা গ্রহণ করে তাহলে চূড়ান্ত ফলাফল শিগগিরই ঘোষণা করা সম্ভব হবে না।

নেভাদায়ও মামলা করেছে ট্রাম্পশিবির : কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে মামলা করার পর এবার নেভাদা অঙ্গরাজ্যেও মামলা করেছে ট্রাম্পের প্রচারশিবির।

এবিসি নিউজ বলছে, অভিযোগগুলোর মধ্যে ভোট গণনা স্থগিত করাসহ আরও কিছু অভিযোগ আছে। যেগুলো এরই মধ্যে অন্য আদালতে উপস্থাপন করে সফল হতে পারেনি ট্রাম্পশিবির।

কোনো প্রমাণ না দিয়েই মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্লার্ক কাউন্টির নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তার মধ্যে তিন হাজারের বেশি অযোগ্য মেইল ইন ভোট ছিল এবং ডাকযোগের ব্যালটের সত্যতা যাচাই প্রক্রিয়াতেও ঘাটতি ছিল।

জর্জিয়া ঘিরে একটি সরল অঙ্ক : নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য জর্জিয়ায় ১ শতাংশ ভোট গণনার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে টপকে যাওয়ায় জো বাইডেন পৌঁছে গেছেন চূড়ান্ত বিজয়ের আরও কাছে।

এখন ১৬ ইলেকটোরাল ভোটের রাজ্য জর্জিয়ায় বাইডেন জিতে গেলে দুটি বিষয় দাঁড়াবে। ১. তখন বাইডেনের পকেটে ইলেকটোরাল ভোট হবে ২৬৯টি। অর্থাৎ, বাইডেন তখন পৌঁছে যাবেন হোয়াইট হাউস থেকে মাত্র এক ভোট দূরত্বে।

২. বাইডেনের ২৬৯ ভোট জিতে নেয়ার মানে দাঁড়াবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মোট ইলেকটোরাল ভোটের অর্ধেক জিতে নিয়েছেন। অর্থাৎ, তখন আর রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের ২৭০ ভোট পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।

তাতে তার সরাসরি ভোটে জিতে পুনর্র্নির্বাচিত হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

জর্জিয়ার পাশাপাশি চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ভোট গণনা চলছে। এর মধ্যে পেনসিলভেইনিয়ায় ২০টি, নর্থ ক্যারোলাইনায় ১৫টি, অ্যারিজোনায় ১১টি এবং নেভাদায় ৬টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট আছে।

বাইডেন যদি জর্জিয়ায় জয়ী হন, তাহলে বাকি চার রাজ্যের যে কোনো একটিতে জয়ী হতে পারলেই তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।

আর এ সরল অঙ্কটি যদি এত সহজে না মেলে, অর্থাৎ ওই চার রাজ্যের সব ইলেকটোরাল কলেজ ভোট যদি ট্রাম্পের পকেটে যায়, তাহলে দুই প্রার্থীরই ভোট হবে সমান, ফলাফল হবে রোমাঞ্চকর ‘টাই’।

রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন পর্যন্ত জিতেছেন ২১৪ ইলেকটোরাল ভোট; চূড়ান্ত জয় পেতে হলে তার আরও ৫৬ ভোট চাই। হোয়াইট হাউসের দখল ধরে রাখতে হলে ট্রাম্পকে জর্জিয়ায় হারলে চলবে না।

সেই সঙ্গে পেনসিলভানিয়া এবং আরও অন্তত দুটি রাজ্যে জিততে হবে। আর যদি ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ‘টাই’ হয়েই যায়, তখন সিদ্ধান্ত দেয়ার ভার পড়বে কংগ্রেসের ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত হবে, কে হবেন প্রেসিডেন্ট। প্রতিটি রাজ্যের একজন করে প্রতিনিধি ভোট দিতে পারবেন।

অন্তত ২৬টি ভোট যিনি পাবেন, তিনিই প্রেসিডেন্ট হবেন। আর সিনেটের ভোটাভুটিতে নির্ধারিত হবে, কে হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ফিলাডেলফিয়ায় গণনা কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় একজন আটক : পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের অন্যতম বড় কাউন্টি ফিলাডেলফিয়ার একটি ভোট গণনা কেন্দ্রে হামলা পরিকল্পনার অভিযোগে এক অস্ত্রধারীকে আটক করেছে পুলিশ।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে ভার্জিনিয়া থেকে ফিলাডেলফিয়াগামী একটি গাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।

বৃহস্পতিবার রাতে ফিলাডেলফিয়া পুলিশ গোপন সূত্রে জানতে পারে, ভার্জিনিয়া থেকে একদল মানুষ গাড়িতে করে ফিলাডেলফিয়া কনভেনশন সেন্টারের দিকে যাচ্ছে।

পুলিশ গাড়িটি আটকায়। গাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়। হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে তাৎক্ষণিক এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পেনসিলভানিয়ায় ভোট গণনা এখনও চলছে।

জর্জিয়ায় ভোট পুনঃগণনা হবে : জর্জিয়া রাজ্যে ভোট ফের গণনা করা হবে বলে জানিয়েছেন রাজ্যটির সেক্রেটারি ব্রড রাফেন্সপারগার। শুক্রবার আটলান্টায় সাংবাদিকদের তিনি এই তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘ভোটের ব্যবধান খুবই সামান্য। ভোট আবার গণনা করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভোট নিয়ে চারদিকে প্রচণ্ড আবেগ রয়েছে। তবে যে বিতর্ক হচ্ছে তা আমাদের কাজকে ব্যাহত করতে পারবে না।

আমরা এটি সঠিকভাবে গ্রহণ করব এবং নির্বাচনের অখণ্ডতা বজায় রাখব।’ উল্লেখ্য, রাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন মাত্র ১৫০০ ভোটের ব্যবধানে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন।

সিনেটে সমানে সমান : এদিকে সিনেটের দখল নিয়ে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। নির্বাচনে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষই জয় পেয়েছে ৪৮টিতে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের দখল নিতে প্রয়োজন মোট ৫১ আসন।

সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও যদি এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকে তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে তা আটকে যেতে পারে।

সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে দুই দলেরই প্রয়োজন আরও অন্তত তিনটি করে আসন। আর বিরোধী দলের প্রেসিডেন্ট হলেও তাকে মোকাবেলায় অন্তত চারটি আসনে জিততে হবে দলগুলোকে।

যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ জন সিনেটরের মেয়াদ থাকে সাধারণত ছয় বছর করে। তবে প্রতি দুই বছর পরপর এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর দেশটিতে নির্বাচন হচ্ছে সিনেটের ৩৫টি আসনে।

অপর দিকে, কংগ্রেসের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে আসন রয়েছে মোট ৪৩৫টি। সেখানে বর্তমানে ডেমোক্রেটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর এই আধিপত্য ধরে রাখতে তাদের প্রয়োজন ২১৮টি আসন।

ফক্স নিউজের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে তারা এখন পর্যন্ত জয় পেয়েছে ২০৮টি আসনে। আর রিপাবলিকানদের জয় ১৯৩টিতে।