স্মৃতির আয়নায় সাংবাদিক বেলায়েত বাবলু

Saturday, October 31st, 2020

বেলায়েত বাবলু:: বরিশালের মিডিয়া পাড়ায় আমি বেলায়েত বাবলু নামে পরিচিত। ১৯৭৬ সালের ১০ অক্টোবর বরিশাল নগরীর কাটপট্টি রোডে জন্মগ্রহণ করি। পিতাঃ খোকা মিয়া ও মাতাঃ মরহুমা রেবা বেগমের ৪ সন্তানের মধ্যে আমি ছোট। মায়ের হাত ধরেই আমি স্কুল ও কলেজের গন্ডি পেরিয়েছি। আমি ১৯৯৪ সালে নগরীর ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় এবং পরে সরকারি বরিশাল কলেজ থেকে বি.এ (পাস) পরীক্ষায় উর্ত্তীন হই। সেখানে পাঠ গ্রহণকালে আমি ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম এবং ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহ-নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার আগ মুহূর্তে আমি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হই। বর্তমানে বরিশালের মূল ধারার সাংবাদিক হিসেবে গন্য না হলেও লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছি। আমি ঢাকার মেয়ে রোমানা আক্তারকে বিয়ে করেছি এবং ১৪ বছরের সুখী দাম্পত্য জীবনে আমি শব্দ হাসান নাফি নামের ৯ বছর বয়সী এক পুত্র সন্তানের জনক।

সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি নাট্যকর্মী হিসেবে কাজ করেছি। আমি বরিশালের অন্যতম নাট্য সংগঠন প্রজন্ম নাট্যকেন্দ্রের হয়ে ১৪টি মঞ্চ নাটকে কাজ করেছি। নাট্যকর্মী বন্ধু জেসন পলাশের হাত ধরে এবং পরিচালক নিয়াজ মাহবুবের সহায়তায় কয়েকটি টেলিভিশন ধারাবাহিক ও একক নাটকে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আওয়ামী লীগের ৫০ বছর পূর্তিতে বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে গীতি নাট্যালেখ্য ‘আলোর পথযাত্রী’ তে কাজ করা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে মনে করি। এছাড়া আমি বরিশাল প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছি। ২০২০ সালের ১৮ মে আমি আমার মাকে হারাই। যা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শোকাবহ ঘটনা। বলে নেয়া ভালো আমি আজ সমাজে যতোটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছি তার পুরোটারই কৃতিত্ব আমার মমতাময়ী মায়ের। বোধকরি আমার মা আমাকে আগলে না রাখলে বেলায়েত বাবলুকে কেউ চিনতোনা। যাক, সব কিছু ছাপিয়ে আমি নিজেকে এখনো মনে মনে একজন সংবাদ কর্মী হিসেবেই জানি।

১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে নাট্যজন সৈয়দ দুলাল সম্পাদিত আনন্দ লিখন (পূর্বে নাম ছিলো আনন্দাকাশ) পত্রিকার চিঠিপত্র বিভাগে লিখতাম। সেই সূত্রধরে পরে ওই পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাই। এর জন্য আমি আপাদমস্তক নাট্য ব্যক্তিত্ব সৈয়দ দুলাল, সংগঠক মিন্টু কুমার কর ও রেজিনা লিনু আপা’র কাছে কৃতজ্ঞ। সেখানে কাজ করার সুবাদে বর্তমানে প্রবাসী জীবনযাপন করা বরিশালে এক সময়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করা নশরত শাহ আজাদ ভাইয়ের সাথে আমার সখ্যতা তৈরী হয়। তিনি আমাকে তাঁদের মালিকাধীন দৈনিক শাহনামা পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ করে দেন। মূলত তাঁর হাত ধরেই আমার দৈনিক পত্রিকায় কাজ করা শুরু। সেখানে কাজ করার সময় আমি শাহনামা পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক কাজী আবুল কালাম আজাদ, নারী নেত্রী প্রফেসর শাহ সাজেদা, ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন, মাসুম শরীফ, জিলানী মিল্টন (বর্তমানে ঢাকায় সাংবাদিকতায় যুক্ত), নান্নু মোল্লা, মাছুম বিল্লাহ, বাপ্পী মজুমদার, এম. মিরাজ হোসাইন, মামুনুর রশিদ নোমানীসহ অনেকের অকৃত্রিম সহযোগিতা পাই। ওই সময়ের বার্তা সম্পাদক গুরুখ্যাত প্রয়াত ওয়াজেদ আলী খানের স্নেহ পেতে আমাকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। একটু বেশী স্নেহ করতেন বলেই তিনি আমাকে হাতে-কলমে খবর তৈরীর কলা-কৌশল শিখিয়েছিলেন। যদিও শুরুতে তিনি আমার লেখা দেখে বলতেন, ‘কি লিখেছো বাপু, কিছুই হয়নি, যাও নতুন করে লিখে নিয়ে আসো।’

লেটার টাইপে শাহনামা পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সেখানে কাজ করার ফলে আমি নিজেকে সমৃদ্ধ করার অনেক সুযোগ পেয়েছিলাম। শিক্ষানবিশ রিপোর্টার হিসেবে শাহনামা পত্রিকায় যোগ দিলেও পরে আমি সেখানে বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তবে আমি থাকা পর্যন্ত শাহনামা লেটারের অক্ষরেই প্রিন্ট হতো। মনে আছে একটা সময় প্রতিদিন সন্ধ্যায় শাহনামা অফিসে যেতাম। কোন নিউজ থাকলে তা লিখে রেখে এসে পরদিন বিবির পুকুর পাড়ে গিয়ে পত্রিকা বিক্রেতা বাক প্রতিবন্ধি আনিসের কাছ থেকে টাকা দিয়ে পত্রিকা কিনে সবার আগে নিজের লেখাটা খোঁজ করতাম। প্রথম প্রথম কোন লেখাই ছাপা না হওয়ায় হতাশ হতাম। একসময় ভাবতাম আমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা। লেখালেখি কি জিনিস তা আমাকে রপ্ত করতেই হবে এ পণ নিয়ে পরে সংকল্প করেছিলাম শাহনামা পত্রিকাতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবো। অনেকের সহযোগিতার ফলে আমি পরবর্তীতে তা হয়তো পেরেওছিলাম। একটা সময় শাহনামার সাথে নিজেকে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে ফেলেছিলাম। সকাল হলেই ছুটে যেতাম পত্রিকা অফিসে।

সেখানে গেলে গুরু ওয়াজেদ আলী খান মুখে মুখে সম্পাদকীয় বলতো আর আমি তা হুবাহু কাগজে তুলতাম। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি কিভাবে সম্পাদকীয় লিখতে হয়। সন্ধ্যা হলেই অফিসে যেতাম। সেখানে গিয়ে টেপ-রেকর্ডারে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা আর বাংলাদেশের এটিএন বাংলার খবর ক্যাসেটে রেকর্ড করতাম (যদিও একাজটি বেশীরভাগ সময় মাসুম বিল্লাহ ভাই করতেন)। রেকর্ড করা শেষ হলে পুরো খবর শুনে সেখান থেকে বেছে বেছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন খবর কাগজে তুলতাম পরের দিনে প্রকাশের জন্য। ওই সময়ে শাহনামায় বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ কম্পোজিটর হিসেবে কাজ করতেন। তারা লেটারের অক্ষর কাঠের তৈরী ফ্রেমে বসাতো আর স্কেল দিয়ে মেপে হিসেব দিতো আর কতোটুকু নিউজ লাগবে। তারা যেমনি মেপে নিউজের হিসেব দিতো তেমনি তারা কতোটুকু (কতো ইঞ্চি) কম্পোজ করেছে তারও হিসাব রাখতো। মাস শেষে ওই হিসেব অনুযায়ীই তাদের বেতন দেয়া হতো।

মনে আছে পত্রিকার ভেতরের দুই আর তিনের পাতার কাজ দুপুরের মধ্যেই শেষ করতে হতো। মফস্বল থেকে ডাক ও ফ্যাক্সযোগে যারা নিউজ পাঠাতেন তাদের পাঠানো বেশীর ভাগ নিউজ দিয়েই দুই ও তিন-এর পাতা সাজানো হতো। অবশ্য মফস্বল প্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ন খবর প্রথম পাতার জন্যও রেখে দেয়া হতো। সন্ধ্যার আগে ভিতরের পাতা প্রিন্ট হয়ে যেতো। শাহনামা পত্রিকায় আমি বেতন কতো পেতাম তা মুখ্য ছিলোনা। মূলত আমি শাহনামায় ছিলাম নিজেকে তৈরী করার জন্য। মনে আছে বার্তা সম্পাদক হিসেবে আমি সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা বেতনে শাহনামায় কাজ করেছি। উল্লেখ্য শাহনামার পাশাপাশি একই হাউস থেকে ট্যাবলেট আকারের বাংলার বনে পত্রিকাও প্রকাশিত হতো। সঙ্গত কারণে সেখানটাতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

দীর্ঘদিন (প্রায় ১০ বছর) সেখানে কাজ করার পর বলতে গেলে সেখানে বসে নিজেকে মোটামুটি তৈরী করার পর জাতীয় দৈনিক যুগান্তরের বরিশাল ব্যুরো প্রধান আকতার ফারুক শাহিনের অনুগ্রহে আমি বরিশালের স্থানীয় দৈনিক আজকের বার্তায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। মূলত সংবাদকর্মী হিসেবে যতোটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছি তার পুরোটাই বলতে গেলে আকতার ফারুক শাহিনের বদৌলতে। তিনি আমাকে যেমনি আধুনিক সাংবাদিকতা শিখিয়েছেন তেমনি আমাকে দেশের শীর্ষ জাতীয় দৈনিক যুগান্তরের বরিশাল ব্যুরো অফিসে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বেলায়েত হাসান বাবলু’ নামটি সংক্ষিপ্ত করে তিনি রেখেছিলেন বেলায়েত বাবলু। তাঁর দেয়া নামেই বরিশালের মিডিয়া পাড়ায় আমি এখনো পরিচিত। মনে আছে আমি যে সময়টাতে যুগান্তর অথবা আজকের বার্তায় কাজ করতাম তখন নিউজ প্রিন্ট কাগজে আমাদের খবর লিখতো হতো। যুগান্তরের বরিশাল জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্রতিনিধি টেলিফোনে অথবা মোবাইলে তাদের এলাকার নিউজের তথ্য আমাকে দিতো। আমি তথ্য নিয়ে সেগুলো নিউজ আকারে লিখে ব্যুরো প্রধান শাহিন ভাইয়ের কাছে জমা দিতাম। তিনি সেগুলো কম্পোজ করিয়ে এডিট করে তা ঢাকায় প্রেরণ করতেন। যুগান্তরে কাজ করার সময় আমি সাংবাদিক রাহাত খানের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিদিন ও নিউজ-২৪ এর বরিশালের দায়িত্বে রয়েছেন। রাহাত ভাইয়ের কাছ থেকেও আমি সংবাদ তৈরীর অনেক কৌশল রপ্ত করতে পেরেছিলাম। শাহিন ভাই নিউজের জন্য মাঝেমধ্যে আমাকে বরিশালের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতেন। তাঁর কারণে আমার বরিশালের বিভিন্ন স্থান যেমন ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে, তেমনি বিভাগের প্রতিষ্ঠিত অনেক সাংবাদিকের সাথে সখ্যতা তৈরী হয়েছে। শাহিন ভাই যখন আজকের বার্তার বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তখন আমি, রাহাত খান, সুমন চৌধুরীর মতো এক ঝাক বয়সে নবীন সংবাদকর্মী কাজ করতাম।

সারাদিন নিউজ সংগ্রহ করে আমাদের সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অফিসে ঢুকতে হতো। দেরী হলে অনেক সময় শাহিন ভাই বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। প্রয়াত জি.এম বাবর আলী কিংবা মুরাদ আহমেদ ভাই যখন আজকের বার্তায় প্রবেশ করতেন তখন পরিবেশই পাল্টে যেতো। ওই সময়ে যারা ফটো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন তাদের অনেক কষ্ট করতে হতো। আমরা স্পেশাল যে নিউজটা করতাম তার বিষয়বস্তু আগে জানিয়ে দিয়ে ফটো সাংবাদিককে ছবি আনতে বলতাম। ফটো সাংবাদিকদের অফিস থেকে তাদের ফ্লিম আর ব্যাটারি দেয়া হতো। গুনে গুনে তাদের ছবি তুলতে হতো। শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ফটো সাংবাদিকরা ফুজি ল্যাব ও কিউ.এস.এস ল্যাবে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলেও শুক্রবার তাদের চিত্ত পান্ডে দা’র কাছে গিয়ে ধর্না দিতে হতো।

সংবাদকর্মী হিসেবে আমি প্রয়াত মিন্টু বসু থেকে শুরু করে অনেক গুনীজনের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আমি বন্ধ হয়ে যাওয়া জাতীয় দৈনিক সকালের খবরের বরিশাল অফিস প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এছাড়া আঞ্চলিক দৈনিক আজকের বার্তার স্টাফ রিপোর্টার, আঞ্চলিক দৈনিক আজকের বরিশালের বার্তা প্রধান, আঞ্চলিক দৈনিক আজকের পরিবর্তনের বার্তা সম্পাদক, আঞ্চলিক দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ পত্রিকার যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, আঞ্চলিক বরিশালের আজকাল ও দৈনিক দক্ষিনাঞ্চল পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। উল্লেখিত পত্রিকাগুলোতে কাজ করতে গিয়ে আমি যাদের অকৃপন সহযোগিতা পেয়েছি তা বলে শেষ করা যাবেনা। আমি যেমন বরিশালের গুনী সাংবাদিকদের সান্নিধ্য পেয়েছি তেমনি বেশ কয়েকজন বন্ধু ও ছোট ভাইও পেয়েছি। বয়সের পার্থক্য থাকলেও আমি, সমকালের সুমন চৌধুরী, নয়া দিগন্তের আযাদ আলাউদ্দীন, কালের কন্ঠের রফিকুল ইসলাম ও চ্যানেল-২৪ এর কাওসার হোসেন রানা ওরফে প্রাচুর্য রানা আমরা যখনই একত্রে মিলিত হই তখন আমাদের বন্ধুত্বপূর্ন সর্ম্পক আরো গভীর হয়ে ওঠে। সংবাদকর্মী হিসেবে আমি বুনিয়াদি থেকে শুরু করে বার্তা সম্পাদকের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। টানা ২৫ বছরের অধিক সময়ে সংবাদপত্রের সাথে জড়িত থাকলেও আজো সাংবাদিক হয়ে উঠতে না পারার দুঃখ আমার রয়েই গেছে।

একসময় পেশাদার সংবাদকর্মী হিসেবে বরিশালের সর্বত্র আমার বিচরণ থাকলেও আজ জীবিকার তাগিদে আমি নামকায়াস্তের সংবাদকর্মী। জানি অনেকে সেটাও মানতে চাইবেন না বা চাননা। শুধুমাত্র বছরের একটি সময়ে আমার মতো বাবলুর কিছুটা কদর হয়। এরপর সবাই যে যার মতো। কেউ খোঁজও রাখেনা। আসলে সংবাদকর্মী হিসেবেই আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণপন চেষ্টা করেছিলাম । এক হাজার টাকার বেতনে কাজ করেও আমি এ পেশা থেকে সরে যেতে চাইনি। কিন্তু যুগান্তরের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ পেয়েও আমাকে শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে হয়েছিলো শুধুমাত্র জীবন ধারণের সংগ্রামে টিকে থাকতে। যুগান্তরের বেতনে যখন সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো তখন অনেকটা অনিশ্চিত ভবিষ্যত জেনেও আমি বরিশাল সিটি করপোরেশনে যোগ দিয়েছিলাম। আসলে আমি খেয়ে পড়ে একটু ভাল থাকার জন্য মেয়র শওকত হোসেন হিরনের পি.এ পদে অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকুরীর জন্য যুগান্তর ছেড়ে ছিলাম। তবে প্রিয় মানুষ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলরাম পোদ্দারের পরামর্শে আমি পরে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে বিসিসিতে কাজ করার জন্য আবেদন করেছিলাম। নানাবিধ কারণে ওই পদটি শেষ পর্যন্ত পাওয়া হয়নি। তবে সংবাদকর্মী ছিলাম বলেই আমি প্রয়াত সফল মেয়র শওকত হোসেন হিরণের দায়িত্ব পালনের সময় ৪ বছরের অধিক সময় বিসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলাম। বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ মহোদয়ও একই পদে কিছুদিন কাজ করার সুযোগ দিয়েছিলেন আমাকে। প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণের অনুগ্রহে আমি বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের একজন নিয়মিত কর্মচারি।

১০ বছর ধরে সিটি কর্পোরেশনে কাজ করলেও আমি লেখালেখি থেকে নিজেকে একদিনের জন্যও বিরত রাখতে পারিনি। ২০১৭ সালে আমি হৃদরোগে আক্রান্ত হই। আমাকে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে জানতেন বলেই প্রয়াত সাংবাদিক, শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লিটন বাশার আমার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অনেক মহান ব্যক্তি আর সাংবাদিকদের দেয়া আর্থিক সহায়তায় তিনি আমার চিকিৎসা করিয়েছিলেন। আমাকে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে জানতেন বলেই প্রয়াত লিটন বাশার আমাকে বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বানিয়ে ছিলেন। আজ বরিশালে ৪০টিরও বেশী পত্রিকা রয়েছে। অনলাইন, টেলিভিশন সাংবাদিকের সংখ্যাও অনেক। কিন্তু প্রকৃত সংবাদকর্মীর সংখ্যা মনে হয় অনেক কমে গেছে।

আগে সাংবাদিকদের মাঝেও প্রতিযোগিতা দেখতাম। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা ছিলো ভালো ভালো রিপোটিংয়ের। স্পেশাল নিউজ আর এক্সক্লুসিভ ছবির পিছনে ছুটতেন সেসময়ের সাংবাদিকরা। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সাংবাদিকরা আলাদাভাবে মূল্যায়িত হতেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও সাংবাদিকদের সমিহ করে চলতেন। কিন্তু আজ যেন তাতে ভাটা পড়েছে। সাংবাদিকদের অনেকে নন্দিত হওয়ার চেয়ে আজকে নিন্দিত হচ্ছেন বেশী। আজকে স্বার্থগত কারণে সাংবাদিক সমাজ দ্বিধা-বিভক্ত। নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ। আজকে সাংবাদিকদের নিয়ে চায়ের আড্ডায় যখন নেতিবাচক আলোচনা হয় তখন কিছুটা হলেও কষ্ট পাই। কারণ পেশাদার হিসেবেই আমিও দীর্ঘ কয়েক বছর এ কাজে ওতোপ্রতভাবে জড়িত ছিলাম।

আজো সন্ধ্যা হলে আর ঘরে বসে থাকতে পারিনা। ছুটে যাই প্রাণের পত্রিকা অফিসে। মাঠ পর্যায় থেকে তুলে আনা তথ্যের ভিত্তিতে খবর তৈরী না করলেও একটা পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার নেপথ্যের কর্মী হিসেবে এখনো নিরলস কাজ করি। এবং আরো যেকটা দিন বেঁচে থাকবো সে কাজ অব্যাহত রাখবো। কি পেলাম আর কি পেলামনা তার হিসেব মেলাতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলি। পরে নিজে নিজেই ভাবি আমি যে পাওয়ার না পাওয়ার চিন্তা করছি, আমি আমার জায়গা থেকে এসমাজকে কতোটুকু দিতে পেরেছি? আসলে দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা যদি একটু ভাবি তাহলে দেখা যাবে এ সমাজ বা রাষ্ট্র আমাকে যা দিয়েছে আমি তার ছিটে ফোটাও সমাজকে দিতে পারিনি। এ লেখার মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। পুরনো কথা লিখতে গিয়ে অনেক বিষয় সামনে এনেছি। অনেক নাম উল্লেখ করেছি আবার কারো কারো নাম নিজের অজান্তেই বাদ পড়ে গেছে। এর জন্য তাঁদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আর লেখাটি লিখতে গিয়ে অনেক সর্তকতা অবলম্বন করার চেষ্টা করেছি। কাউকে হেয় অথবা ছোট করার জন্য কিছু লিখিনি। তারপরেও আমার এ লেখায় কেউ যদি সামান্যও কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে তাঁদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।