বরিশালের হিজলার মানচিত্রে শব্দহীন বজ্রাঘাত,একক আসন মেহেন্দিগঞ্জ !(২য় পর্ব)

Monday, June 15th, 2020

সাইফুল ইসলাম :; হিজলার মানচিত্রে শব্দহীন বজ্রাঘাত ! ক্ষত-বিক্ষত হিজলার মানচিত্র। বারবার কাটছাট হচ্ছে হিজলার মানচিত্র। স্বাধীনতার পর থেকে হিজলা উপজেলার মানচিত্রে আঘাত হানছে বহু বার। এখন পর্যন্ত চলছে কাট এবং ছাট। কাটা ছেড়ায় হিজলা উপজেলা হচ্ছে খাটো। শকুনি মামার আছর ছাড়ছে না হিজলা উপজেলাকে। ২০১৯ সালে হিজলা উপজেলার হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের ৪টি মৌজা কেটে সংযুক্ত হয় মেহেন্দিগঞ্জের গবিন্দপুর ইউনিয়নের সাথে। মেঘা, চর মেঘা, জোয়ারখালী, চরভুলা এখন আর হিজলার থাকছেনা।
একক আসন মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা ! -এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। একক আসনের জন্য ৩ লাখ ভোটারের প্রয়োজন উপজেলার। সে ক্ষেত্রে ২০১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। আয়তনেও বাড়ছে উপজেলাটি। বর্তমান সময়ে হিজলা উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, হিজলা উপজেলার ভোটার সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৪ হাজার ৬ শত ৮৬ জন।

এতো লোভ কেন হিজলার উপরে ঃ গৌরবময় হিজলা, গৌরবময় হিজলাগৌরব্দী। আদর্শ আর সভ্যতায় হিজলা উপজেলার জুড়ি নেই। সভ্যতার নিদর্শন হিজলা, উর্বর ভূুমি, সভ্য মানুষ, র্দুভাগ্য হিজলার মেঘনা। নিয়ন্ত্রনহীন মেঘনা এখানকার মানুষকে অসভ্যতা শিখিয়েছে। ১৯০০ সালের দিকে হিজলার জনপদ ছিল উন্নত। শিক্ষায় এখানকার মানুষকে করেছে আরও উন্নত। বর্মিদের হটানোর জন্য এ হিজলা উপজেলায় এক সময় গবিন্দপুরের নলগোড়ায় মগ তাড়ানোর জন্য দুর্গ তৈরী হয়েছিল।

তা হয়তো আজকের শিক্ষতি সমাজ বা জনপ্রতিনিধিরা জানেন না। এ হিজলায় সর্বপ্রথম উ”চশিক্ষার জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯১১ সালে। আষ্টম জর্জ হিজলা উপজেলায় আগমনের পর গোবিন্দপুরের গোয়ালভাওর মৌজায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন হিজলাবাসি। প্রথম দিকে এর নাম ছিল গোয়াল ভাওর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। অষ্টম জর্জের আগমনে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “উত্তর শাহবাজপুর জর্জ ইনষ্টিটিউট মাধ্যমিক বিদ্যালয়”। তথ্যসূত্র জামাল মাষ্টার বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক। এর একবছর পরে মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া জমিদার পরিবার আর একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং অমর একুশে ফেব্রুয়ারির গান রচয়িতা আঃ গাফ্ফার চৌধুরীর বাড়ির সামনে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। নাম রাখেন উলানিয়া করনেশণ মাধ্যমিকি বদ্যালয়। হালে উপজেলায় হাজার হাজার একর জমি সরকারের। এর থেকে রাজস্ব আদায় নেই। আছে নগদ অর্থ উপার্জন। প্রকৃতির দান পানি, রুপলি ইলিশ, ঘাস, লতা-পাতা সব গুলোতেই নগদ টাকা। বিশাল অরক্ষিত ভূমি আর নগদ অর্থই অন্ধ করছে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে। অন্ধগলিতে হাটছে তাঁরা।
সংখ্যালঘুর কাতারে হিজলা উপজেলা। কোথায় যাচ্ছে হিজলা ? কোন পথে গড়াচ্ছে হিজলার রাজনীতি ! বন্ধ্যাত্বের শিকার হচ্ছে হিজলা উপজেলা এবং উপজেলার রাজনীতিবিদরা।

হিজলার মানচিত্রে সর্ব প্রথম আঘাত হানে ১৯৮৮ সালে। সে বছর হিজলা উপজেলার একটি ইউনিয়ন সংযুক্ত হয় মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার সাথে। পুরো গোবিন্দপুর ইউনিয়ন চলে যায় হিজলার মানচিত্র থেকে ছিটকে। লোকমুখে ইউনিয়নটির নাম ছিল কালিগঞ্জ। বাহেরচর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবুল হাশেম মোঃ বশির উল্লাহ ছিলেন গবিন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত হিজলা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। তৎকালীন সময়ে ইউনিয়নটির নামকরণ করা হয় ইসলামগঞ্জ। নাম রাখা পর্যন্তই শেষ,বাস্তবায়ন করতে পারেননি চেয়ারম্যান বশির উল্লাহ। তৎকালীন মোশাররফ হোসেন মঙ্গু বিএনপির এমপি থাকাকালীন ইউনিয়নটিকে স¤পূর্ণ রূপে মেহেন্দিগঞ্জের ১৩ নং ইউনিয়ন পরিষদ হিসাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। এর পরের বছর আবার আঘাত হানে হিজলার মানচিত্রে। হিজলা উপজেলার ১ নং ইউনিয়ন পরিষদ হরিনাথপুর। এর একটি অংশ কুচাইপট্টি, ভীমখিল,মশুরগাঁও, কোদালপুর, চরমাইঝারী, বইখোলা, পাঁচকাঠি, চরজানপুরসহ একটি নতুন ইউনিয়ন গঠিত হয়। নামকরণ করা হয় কুচাইপট্ট্রি ইউনিয়ন।

বিএনপির পুরো ক্ষমতার সময়। তখন এমপি মোশাররফ হোসেন মঙ্গু। দু’ দুটি ইউনিয়ন হিজলা থেকে বিদায় হওয়াকে মঙ্গুর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন হিজলাবাসী। এক বছরের মধ্যে কুচাইপট্টি একটি ইউনিয়নের মর্যাদা পায়। এক সময় হরিনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন আবুল বাশার মুন্সির পিতা আঃ মন্নান মানু মুন্সি। কুচাই পট্টি ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা আবুল বাশার মুন্সি, তিনিই পরবর্তীতে কুচাইপট্ট্রি ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তিনি কুচাইপট্ট্রি ইউনিয়নটিকে ঢাকা বিভাগের শরিয়তপুর জেলার ঘোষাইহাট উপজেলার সাথে সংযুক্ত করেন। ১৯৯১ সালে ইউনিয়নটির অফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু হয় ঘোষাইরহাট উপজেলার সাথে।
এবার আবার হিজলা উপজেলার মানচিত্রে শকুনের থাবা। স্বাধীনতার সপক্ষের দল আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। ক্ষমতায় সরকার দলীয় এমপি, চলছে শর্টকাট কার্যক্রম। হিজলা উপজেলার ৫ নং হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়ন, ইউনিয়নের বেশ ক’টি মৌজা কেটে আবার সংযুক্ত হচ্ছে মেহেন্দিগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের সাথে। ২০২০ সালেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর পালা।

হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিস সূত্রে জানা যায়-“গোবিন্দপুর ইউনিয়নের নতুন সীমানা নির্ধারণী কার্যক্রম ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগেই কার্যক্রম শেষ, যুক্ত হয়েছে হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের ৪টি মৌজা। মেঘা, চরমেঘা, জোয়ারখালী, চরভুলা এখন গেজেটভূক্ত গোবিন্দপুরের সাথে। গেজেটও চুড়ান্ত, এখন কার্যক্রমের পালা।” শুধু ভূমি অফিসের বালাম বই/খতিয়ান বই হস্তান্তর বাকি”।
আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায়। ২০২০ সাল। বিষে বিষে বিষাক্রান্তÍ-নীল বর্ণ এখন হিজলার। হিজলার এ পরিণতির দায় নেবেন কে ? -দায় নেই কারও। ক্ষমতায় সরকার দলীয় এমপি, দলীয় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং ইউপি চেয়ারম্যানগণ। তার পরেও নীরবে কাঁদছে হিজলা; পাশে দাঁড়ায়নি কোনো পক্ষ-বাকহীন, বন্ধ্যা হিজলার রাজনীতিবিদরা।

হিজলা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মিলন। আবার হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও তিনি। তাঁর ইউনিয়ন কেটে সংযুক্ত হচ্ছে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের সাথে। হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের মৌজা কাটা এবং গোবিন্দপুরের সাথে সংযুক্তির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। কেবল লোকমুখে শুনেছেন-তার কোন প্রতিক্রিয়াও নেই। ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার জাহিদুল ইসলাম জানান, তার ওয়ার্ড থেকে চারটি মৌজা কাটা হয়।

এ বিষয়ে আদালতে মামলা চলছে। তবে গেজেট চুড়ান্ত হয়েছে তা জানা নেই।
সাবেক ধুলখোলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন মাতুব্বর। তিনিও হিজলা উপজেলা আওয়ামীলীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক-তাঁর ইউনিয়নও খাটো হচ্ছে। পোড় খাচ্ছে হিজলাবাসী। কপাল খুলছে মেহেন্দিগঞ্জবাসীর। ইকবাল হোসেন মাতুব্বর জানান-তার ইউনিয়নের কোনো মৌজা কাটা হয়নি। ২০১৮ সালের দিকে তাঁর চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় মেহেন্দিগঞ্জ ইউএনও দীপক রায়কে দিয়ে হিজলা উপজেলার হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের ৪টি মৌজা কেটে নিয়ে গোবিন্দপুরের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এ বিষয়ে তার কোনো মতামত নেই। বর্তমান ধুলখোলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক হিজলা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মকবুল আহম্মেদ মিয়া জানান, বিষয়টি সামগ্রিকভাবে হিজলাবাসীর জন্য বেদনাদায়ক। তার ইউনিয়নের কোনো অংশ কাটা হয়নি। হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের অংশ কাটছাট হয়েছে বলে তিনি জানেন। ঐ ইউনিয়নের বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য নেই।

এ্যডঃ মাহাবুবুল আলম দুলাল জানান, হিজলায় মিরজাফরের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বেনিয়ার দলেরা অর্থকামাতে আসছে। হিজলার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য জন জন প্রতিনিধিরাই দায়ী। জনপ্রতিনিধিদের জন্মভূমির জন্য দায় নেই। অর্থ কামানোও শেষ ওরাও শেষ। এ্যাডঃ আফজালুল করিম জানান, মন্তব্য করার কিছুই নেই। চামচাদের চামচামির কারণে আমার হিজলাবাসীর এ দশা। ওরা আর কিছিু দিন পর হিজলার বানান পরিবর্তন করে লিখতে পারে। এ্যাডঃ আমিনুল ইসলাম স্বপন চৌধুরীর মন্ত্যকরার ভাষা হারাচ্ছেন।
বর্তমান হিজলা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও হিজলা থানা আ’লীগ সহসভাপতি বেলায়েত হোসেন ঢালীও জানান- তিনি এই প্রথম শুনলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হিজলা উপজেলার একটি অংশ অন্য উপজেলায় সংযুক্ত হলে উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদের জানার কথা। তিনি তো এমন কোনো তথ্যই পাননি বা তার পরিষদে কোনো আলোচনাই হয় নি।

হিজলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আমীনুল ইসলাম জানান-হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের ৪টি মৌজা মেহেন্দিগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের সাথে সমন্বয় করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে সত্য। তবে যা হয়েছে তাঁর হিজলা উপজেলায় যোগদানের আগে।