বরিশালের  হিজলার মানচিত্রে শকুনের থাবা॥একক আসন মেহেন্দিগঞ্জ !(১ম পর্ব)

Thursday, June 11th, 2020

সাইফুল ইসলাম,স্টাফ রিপোর্টার হিজলা ।।  ক্ষত-বিক্ষত হিজলার মানচিত্র। বারবার কাটছাট হচ্ছে হিজলার মানচিত্র। স্বাধীনতার পর থেকে হিজলা উপজেলার মানচিত্রে আঘাত হানছে বহু বার। এখন পর্যন্ত চলছে কাট এবং ছাট। কাটা ছেড়ায় হিজলা উপজেলা হচ্ছে ছোট থেকে আরও ছোট। শকুনি মামার আছর ছাড়ছে না হিজলা উপজেলাকে।

একক আসন মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা ! -এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। একক আসনের জন্য ৩ লাখ ভোটারের প্রয়োজন উপজেলার। সে ক্ষেত্রে ২০১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। আয়তনেও বাড়ছে উপজেলাটি। বর্তমান সময়ে হিজলা উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, হিজলা উপজেলার ভোটার সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৪ হাজার ৬ শত ৮৬ জন।
সংখ্যালঘুর কাতারে হিজলা উপজেলা। কোথায় যাচ্ছে হিজলা ? কোন পথে গড়াচ্ছে হিজলার রাজনীতি ! বন্ধ্যাত্বের শিকার হচ্ছে হিজলা উপজেলা এবং উপজেলার রাজনীতিবিদরা। হিজলার মানচিত্রে সর্ব প্রথম আঘাত হানে ১৯৮৮ সালে।

সে বছর হিজলা উপজেলার একটি ইউনিয়ন সংযুক্ত হয় মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার সাথে। পুরো গোবিন্দপুর ইউনিয়ন চলে যায় হিজলার মানচিত্র থেকে ছিটকে। লোকমুখে ইউনিয়নটির নাম ছিল কালিগঞ্জ। বাহেরচর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবুল হাশেম মোঃ বশির উল্লাহ ছিলেন গবিন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত হিজলা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। তৎকালীন সময়ে ইউনিয়নটির নামকরণ করা হয় ইসলামগঞ্জ। নাম রাখা পর্যন্তই শেষ,বাস্তবায়ন করতে পারেন নি চেয়ারম্যান বশির উল্লাহ।

তৎকালীন মোশাররফ হোসেন মঙ্গু এমপি থাকাকালীন ইউনিয়নটিকে স¤পূর্ণ রূপে মেহেন্দিগঞ্জের ১৩ নং ইউনিয়ন পরিষদ হিসাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। এর পরের বছর আবার আঘাত হানে হিজলার মানচিত্রে। হিজলা উপজেলার ১ নং ইউনিয়ন পরিষদ হরিনাথপুর। এর একটি অংশ কুচাইপট্টি, ভীমখিল,মশুরগাঁও, কোদালপুর, চরমাইঝারী, বইখোলা, পাঁচকাঠিসহ একটি নতুন ইউনিয়ন গঠিত হয়। নামকরণ করা হয় কুচাইপট্ট্রি ইউনিয়ন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আবুল বাশার মুন্সি।

বিএনপির পুরো ক্ষমতার সময়। তখন এমপি মোশাররফ হোসেন মঙ্গু। দু’ দুটি ইউনিয়ন হিজলা থেকে বিদায় হওয়াকে মঙ্গুর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন হিজলাবাসী। এক বছরের মধ্যে কুচাইপট্টি একটি ইউনিয়নের মর্যাদা পায়। এক সময় হরিনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন আবুল বাশার মুন্সির পিতা আঃ মন্নান মানু মুন্সি। কুচাই পট্টি ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা আবুল বাশার মুন্সি, তিনিই পরবর্তীতে কুচাইপট্ট্রি ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তিনি কুচাইপট্ট্রি ইউনিয়নটিকে ঢাকা বিভাগের শরিয়তপুর জেলার ঘোষাইহাট উপজেলার সাথে সংযুক্ত করেন। ১৯৯১ সালে ইউনিয়নটির অফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু হয় ঘোষাইরহাট উপজেলার সাথে।

এবার আবার হিজলা উপজেলার মানচিত্রে শকুনের থাবা। স্বাধীনতার সপক্ষের দল আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। ক্ষমতায় সরকার দলীয় এমপি, চলছে শর্টকাট কার্যক্রম। হিজলা উপজেলার ৫ নং হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়ন এবং ধুলখোলা ইউনিয়নের বেশ ক’টি মৌজা কেটে আবার সংযুক্ত হচ্ছে মেহেন্দিগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের সাথে। ২০২০ সালেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর পালা।

হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিস সূত্রে জানা যায়-“গোবিন্দপুর ইউনিয়নের নতুন সীমানা নির্ধারণী কার্যক্রম ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগেই কার্যক্রম শেষ, যুক্ত হয়েছে হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের ৪টি মৌজা। গেজেটও চুড়ান্ত, এখন কার্যক্রমের পালা।” এখন শুধু ভূমি অফিসের বালাম বই/খতিয়ান বই হস্তান্তর বাকি।

আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায়। ২০২০ সাল। বিষে বিষে বিষাক্রান্তÍ-নীল বর্ণ এখন হিজলার। হিজলার এ পরিণতির দায় নেবেন কে ? -দায় নেই কারও। ক্ষমতায় সরকার দলীয় এমপি, দলীয় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং ইউপি চেয়ারম্যানগণ। তার পরেও নীরবে কাঁদছে হিজলা; পাশে দাঁড়ায়নি কোনো পক্ষ-বাকহীন হিজলার রাজনীতিবিদরা।
হিজলা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মিলন। আবার হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও তিনি। তাঁর ইউনিয়ন কেটে সংযুক্ত হচ্ছে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের সাথে। হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের মৌজা কাটা এবং গোবিন্দপুরের সাথে সংযুক্তির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। কেবল লোকমুখে শুনেছেন-তার কোন প্রতিক্রিয়াও নেই।

সাবেক ধুলখোলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন মাতুব্বর। তিনিও হিজলা উপজেলা আওয়ামীলীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক-তাঁর ইউনিয়নও খাটো হচ্ছে। পোড় খাচ্ছে হিজলাবাসী। কপাল খুলছে মেহেন্দিগঞ্জবাসীর। এ যেন মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলাবাসীর আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া। ইকবাল হোসেন মাতুব্বর জানান-তার ইউনিয়নের কোনো মৌজা কাটা হয়নি। ২০১৮ সালের দিকে তাঁর চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় মেহেন্দিগঞ্জ ইউএনও দীপক রায়কে দিয়ে হিজলা উপজেলার হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের ৪টি মৌজা কেটে নিয়ে গোবিন্দপুরের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এ বিষয়ে তার কোনো মতামত নেই।

বর্তমান ধুলখোলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মকবুল আহম্মেদ মিয়া জানান, বিষয়টি সামগ্রিকভাবে হিজলাবাসীর জন্য বেদনাদায়ক। তার ইউনিয়নের কোনো অংশ কাটা হয়নি। হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের অংশ কাটছাট হয়েছে বলে তিনি জানেন। ঐ ইউনিয়নের বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য নেই।
বর্তমান হিজলা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও হিজলা থানা আ’লীগ সহসভাপতি বেলায়েত হোসেন ঢালীও জানান- তিনি এই প্রথম শুনলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হিজলা উপজেলার একটি অংশ অন্য উপজেলায় সংযুক্ত হলে উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদের জানার কথা। তিনি তো এমন কোনো তথ্যই পাননি বা তার পরিষদে কোনো আলোচনাই হয় নি।

হিজলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আমীনুল ইসলাম জানান-হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের ৪টি মৌজা মেহেন্দিগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের সাথে সমন্বয় করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে সত্য। তবে যা হয়েছে তাঁর হিজলা উপজেলায় যোগদানের আগে।