১৩ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

ধর্ষিত কিশোরীর বাবাকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর,দুই লাখ টাকা মাতবরদের পকেটে

আপডেট: অক্টোবর ২৫, ২০১৯

বিজয় নিউজ: ঢাকার ধামরাইয়ে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। এতে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে ভোক্তভুগীর বাবাকে আটকে রেখে সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয় একটি চক্র। এদিকে ধর্ষককে প্রায় দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

জরিমানার টাকা ভোক্তভুগীর পরিবারকে না দিয়ে স্থানীয় মাতবররা ভাগ করে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধর্ষণকাণ্ডে অভিযুক্ত মোকছেদ আলী (৫৫) পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান। তারও রয়েছে তিন ছেলে এবং এক মেয়ে। ঘটনাটি ঘটেছে ধামরাইয়ে চৌহাট ইউনিয়নে।

ভোক্তভুগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, সোনিয়া (ছদ্মনাম) স্থানীয় একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় সোনিয়া একটু বড় হয়ে স্কুলে যেতে শুরু করে। বর্তমানে বসয় ১৩ বছর। তার বাবা দিনমজুর ও মা সাটুরিয়াতে ঝিয়ের কাজ করেন। প্রতিদিনের মতো সোনিয়াকে বাড়িতে রেখে তারা কর্মস্থলে চলে যান। সোনিয়া পাশের মোকছেদ আলীর (৫৫) বাড়িতে প্রায়ই টেলিভিশন দেখতে যায়।

এ সুযোগে মোকছেদ আলী ওই সোনিয়াকে জোর করে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের কথা কাউকে জানালে তাকে জবাই করে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয় মোকছেদ আলী। কিছুদিন পর মেয়েটির মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি তার মাকে জানায় সোনিয়া। মা-বাবা সাটুরিয়াতে একটি ক্লিনিকে পরীক্ষা করায় সোনিয়াকে। এতে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে বলে তাদের জানানো হয়। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

একপর্যায়ে কয়েকজনের মাধ্যমে ভোক্তভুগীর পরিবারের সঙ্গে আপোষের চেষ্টা চালায় মোকছেদ আলী। একটি চক্র গত রবিবার ও সোমবার মেয়েটির বাবাকে দুই দফা আটক করে রাখে। সোমবার ধামরাইয়ে আমতা ইউনিয়নের নান্দেশ্বরী গ্রামের বাস চালক চানমিয়ার বাড়িতে আটক রেখে মেয়েটির বাবার কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয় চক্রের সদস্য চৌহাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফারুক হোসেন, বালিয়াটি ঈশ্বর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আল আমীন, মুন্সিরচর গ্রামের মরন আলী, মোকছেদ ও তার ভাই দরবার আলী, অলক রায়, আবু বক্কর সিদ্দিক।

এদিকে ভোক্তভুগীর বাবাকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলে জোরপূর্বক আপোষনামায় স্বাক্ষর করায় তারা। কিন্তু গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কোনো টাকা ভোক্তভুগীর পরিবারকে দেওয়া হয়নি।

ভোক্তভুগীর বাবা বলেন, ‘ভয়ভীতি দেখিয়ে সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়েছে চানমিয়া, ফারুক মেম্বার, আল আমীন, অলক রায়, আবু বক্রসহ কয়েকজন মিলে। আমি বিষয়টি মেনে নিতে পারিনাই বিধায় আমার সমাজের মাতাবর রজ্জব বেপারী, মরণ বেপারী ও সোনা মিয়াকে বিষয়টি জানিয়েছি।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন ভোক্তভুগীর বাবার কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া কথা স্বীকার করে বলেন, চানমিয়ার বাড়িতে মীমাংসা করা হয়েছে। জরিমানার এক লাখ ৮০ হাজার টাকার মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পাবে।

এদিকে সালিসে উপস্থিত থাকা বালিয়াটি ঈশ্বর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আল আমীন জানান, জরিমানার ৬০ হাজার টাকা মাতাবররা ভাগ করে নিয়েছে। বাকি এক লাখ ২০ হাজার টাকা ভোক্তভুগীর পরিবারকে দেওয়ার কথা।

সালিসের প্রধান মাতাবর চানমিয়া বলেন, মোকছেদ আলীকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার সব টাকা না দেওয়ায় এখনো মীমাংসা হয়নি। তবে জরিমানার ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, সালিসে উপস্থিত অলক রায় ও আবু বক্কর সিদ্দিককে ২০ টাকা দিয়ে ভোক্তভুগীর পিতার স্বাক্ষর করা স্ট্যাম্প আনা হয়েছে।

ধামরাই সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে গতকাল বৃহস্পতিবার বৃষ্টি ভেজা দিনে সরেজমিনে গিয়ে মোকছেদ আলীকে পাওয়া যায়নি তার বাড়িতে। তার ছেলের বউ রেহেনা আক্তার বলেন, তার শ্বশুর তিনদিন ধরে বাড়িতে আসেন না। তবে তিনি বলেন, সোনিয়া আমাদের বাড়িতে প্রায়দিনই টেলিভিশন দেখার জন্য আসতো। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা কতটুকু সত্য তা জানি না।

এ দিকে ভোক্তভুগীর পরিবারের চার সদস্য লজ্জা ও ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না বলে জানান সোনিয়ার বাবা-মা। তিনি আইনগত ব্যবস্থা নিতেও সাহস পাচ্ছেন না। তবে তারা ধর্ষণকারীর শাস্তি চান।

ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দীপক চন্দ্র সাহা বলেন, ধর্ষণের ঘটনা সামাজিকভাবে আপোষযোগ্য নয়। যারা আপোষ করেছে ধর্ষণকারীসহ তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

157 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন