শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ: বরিশালের মাদ্রাসায় শানে সাহাবার ‘পরিদর্শন’ নিয়ে তোলপাড়

আপডেট: September 9, 2026

কামরুল হাসান রাসেলঃঃ শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগে বরিশাল নগরীর তাহফিজুল মিল্লাত মডেল মাদ্রাসা যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, ঠিক তখনই ঢাকার একটি সংগঠনের প্রতিনিধি দলের ‘পরিদর্শন’ ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে একাধিক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তাধীন। এর মধ্যেই শানে সাহাবা জাতীয় খতীব ফাউন্ডেশনের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল মাদ্রাসায় গিয়ে কী উদ্দেশ্যে পরিদর্শন করল—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে ঢাকাস্থ ওই সংগঠনের প্রতিনিধি দল নগরীর সিএন্ডবি রোডের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের কাজীপাড়া সিএন্ডবি এলাকার তাহফিজুল মিল্লাত মডেল মাদ্রাসায় যায়। তারা মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নেন বলে জানা গেছে।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন শানে সাহাবা জাতীয় খতীব ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ মুফতি শামীম মজুমদার, মহাসচিব মুফতি শরীফ উল্লাহ তারেকী, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন সালেহী, কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মুফতি আরিফুল ইসলাম কারিমীসহ আরও একজন সদস্য।
অভিভাবকদের প্রশ্ন—কোন ক্ষমতাবলে ‘তদন্ত’?
ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের প্রশ্ন, শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা তদন্ত করার আইনগত এখতিয়ার ওই সংগঠনের আছে কি না।
তাদের দাবি, এ ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনায় তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কোনো বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধি দল এসে নিজেদের মতো করে পরিদর্শন করলে সেটি তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
অভিভাবকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে বাইরে থেকে লোকজন এনে মাদ্রাসা পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে।
এমনকি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এনে পরিস্থিতি নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন অভিভাবক ও স্থানীয় ব্যক্তি। তবে অর্থ লেনদেনের এ অভিযোগের  প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
পরিদর্শন ঘিরে উত্তেজনা, ধাওয়ার অভিযোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিনিধি দলের মাদ্রাসায় আসাকে কেন্দ্র করে একপর্যায়ে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ স্থানীয় ও অভিভাবকদের ধাওয়ার মুখে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মাদ্রাসা এলাকা ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে আরও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
তাদের বক্তব্য, ‘শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগের বিচার ও তদন্ত চাই। লোক দেখানো পরিদর্শন কিংবা প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।’
পরিচালকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের তদন্ত দাবি
সম্প্রতি মাদ্রাসার পরিচালক শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দেয়।
অভিযোগের বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) লুৎফর রহমান জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মাদ্রাসায় গেলেও পরিচালক শফিকুল ইসলামকে সেখানে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদ্রাসার শিক্ষক মো. বায়জিদ বলেন, শিক্ষার্থীরা শিশু। অভিভাবকেরা সন্তানদের শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের ওপর আস্থা রেখে মাদ্রাসায় পাঠান। কোনো শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাদ্রাসার পরিচালক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
‘ঘটনা ধামাচাপা’ নাকি সত্য উদঘাটন—জবাব চায় অভিভাবকরা
শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগের মতো গুরুতর ঘটনায় কোনো ধরনের প্রভাব, অর্থ কিংবা সংগঠনের তৎপরতা যেন তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে—এ দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
একই সঙ্গে শানে সাহাবা জাতীয় খতীব ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি দল কেন মাদ্রাসায় গেল, কার আমন্ত্রণে গেল, কী উদ্দেশ্যে গেল এবং তাদের পরিদর্শনের আইনগত ভিত্তি কী—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দাবি করেছেন তারা।
অভিভাবকদের ভাষায়, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ‘সমঝোতা’ নয়—প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের কঠোর প্রয়োগ।
তবে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার আগে পরিচালক শফিকুল ইসলামসহ কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। একইভাবে সংগঠনটির বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন মনে করে এলাকাবাসী।

40 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন