
আপডেট: September 9, 2026
কামরুল হাসান রাসেলঃঃ বরিশাল নগরীর একটি মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে একের পর এক শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের গুরুতর অভিযোগ ঘিরে যখন তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে, তখন ওই পরিচালকের পক্ষে ঢাকার একটি সংগঠনের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল এসে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার পরিচালক এর আগেও এক শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকার করেছিলেন। ওই ঘটনার পর বিষয়টি চরমোনাইর পীরের কাছে গোপনে ‘বিচার’ করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক।
ওই অভিভাবক প্রতিবেদককে বলেন, আগের ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা ও বিচার হয়েছিল। কিন্তু এরপরও একই পরিচালকের বিরুদ্ধে আবারও দুই শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
অভিভাবকের প্রশ্ন, আগের অভিযোগের পর যদি বিষয়টি নিয়ে সত্যিই বিচার হয়ে থাকে, তাহলে অভিযুক্ত পরিচালকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন?
এবার অভিযোগ সামনে আসতেই ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যানের আগমন
দুই শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগ সামনে আসার পর মাদ্রাসা পরিচালকের বিরুদ্ধে আইনগত ও সামাজিক চাপ তৈরি হলে হঠাৎ করে সেখানে উপস্থিত হন শানে সাহাবা জাতীয় খতীব ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ মুফতি শামীম মজুমদার।
তিনি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিনিধি নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে পরিচালকের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এই সময়ে তার সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন হলো কেন?
অভিভাবকদের একটি অংশের অভিযোগ, পরিচালক নিজেকে রক্ষা এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হিসেবে ওই সংগঠনের চেয়ারম্যানকে অর্থের বিনিময়ে নিয়ে আসতে পারেন।
তাদের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পক্ষের হয়ে অর্থের বিনিময়ে লোকজন উপস্থিত করানো বা বক্তব্য দেওয়ানোর সঙ্গে ওই চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততার কথা শোনা যায়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
‘টাকার বিনিময়ে বক্তব্য’—প্রশ্নের মুখে চেয়ারম্যান
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, শিশুদের বলাৎকারের মতো গুরুতর অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই কেন একটি সংগঠনের চেয়ারম্যান মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষে বক্তব্য দেবেন?
যদি তিনি নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে থাকেন, তাহলে তার বক্তব্যে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, শিশুদের নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি থাকার কথা। কিন্তু তার ভূমিকা যদি কোনো পক্ষকে রক্ষা করা বা জনমত প্রভাবিত করার পর্যায়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
অভিভাবকদের দাবি, কেউ টাকা দিয়ে কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিকে এনে শিশু বলাৎকারের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
আগের ‘গোপন বিচার’ নিয়েও তদন্তের দাবি
অভিভাবকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগে একটি শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগের পর মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে চরমোনাইর পীরের কাছে গোপনে বিচার হওয়ার বিষয়টি সত্য কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ কেন আইনগত প্রক্রিয়ায় না গিয়ে গোপন বিচারের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছিল?
অভিভাবকদের দাবি, আগের ঘটনা থেকে বর্তমান অভিযোগ পর্যন্ত পুরো বিষয়টি তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
নিরপেক্ষ তদন্ত চান অভিভাবকরা
শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
একই সঙ্গে শানে সাহাবা জাতীয় খতীব ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ মুফতি শামীম মজুমদারের কাছে প্রশ্ন উঠেছে—
কেন তিনি ওই মাদ্রাসায় গেলেন?
কার আমন্ত্রণে গেলেন?
কার পক্ষে বক্তব্য দিলেন?
তার যাতায়াত ও কার্যক্রমের অর্থের উৎস কী?
এবং মাদ্রাসা পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ যাচাই করেছেন?
এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।
তবে মাদ্রাসা পরিচালক ও ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।