২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার

আওয়ামী অপশাসনের সহযোগী ও টেস্ট বাণিজ্য-দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ডা. মো: মনিরুজ্জামানকে, পদোন্নতি দিয়ে বরিশালে সিভিল সার্জন করা হলো রোগীদের আন্দোলন ও মহাসড়ক অবরোধের রেশ কাটতে না কাটতেই বিতর্কিত কর্মকর্তাকে বড় দায়িত্বে পদায়ন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা

আপডেট: জুলাই ২৪, ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার ঃঃ টেস্ট বাণিজ্য, দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা ও রোগীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে যাঁকে অপসারণের দাবিতে বরিশালের গৌরনদীতে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ও কুশপুত্তলিকা দাহ করেছিলেন স্থানীয় জনতা, সেই ডা. মো. মনিরুজ্জামানকেই এবার পদোন্নতির আদলে বরিশালের সিভিল সার্জন (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ঘটনাটি স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, প্রশাসন-২ শাখা থেকে গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে (স্মারক নম্বর: ৪৩.০০.০০০০.২৪৮.০১৯.০০৬.২০২৫-৯১৪) বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। তারমধ্যে ওএসডি হিসেবে কর্মরত ডা. মো. মনিরুজ্জামানকে (কোড ১১৩১২৫) বরিশালের সিভিল সার্জন (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, বদলিকৃত কর্মকর্তাদের আগামী ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে, অন্যথায় ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে তাঁরা বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত (স্ট্যান্ড রিলিজড) বলে গণ্য হবেন। যুগ্মসচিব সাইফুল ইসলামের স্বাক্ষরে জারি করা এই আদেশের অনুলিপি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৪ জুলাই সোমবার সকালে গৌরনদী উপজেলা হাসপাতাল রোডে ‘সর্বস্তরের জনতা’র ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। পরে বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের আশোকাঠী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রায় দেড় ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন, যাতে মহাসড়কজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, তৎকালীন গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মনিরুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে সরকারি পরীক্ষাগার উপেক্ষা করে কমিশনের বিনিময়ে রোগীদের নির্দিষ্ট কয়েকটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাতে পাঠাতেন। আন্দোলনের মুখে প্রশাসন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছিল, তবে বিক্ষোভ চলাকালে অভিযুক্ত কর্মকর্তা কোনো বক্তব্য না দিয়েই হাসপাতাল থেকে কৌশলে সরে যান।
সে সময় উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রুবেল গোমস্তা বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য বিভাগ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, ফলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। আন্দোলনকারীরা তখন হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, ডা. মো: মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বদলির আদেশ জারির সময় তাঁদের নজরে ছিল না। বিষয়টি এখন তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছে জানিয়ে, তিনি বিভাগীয় পর্যায়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া আরেকটি নথি থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা থাকাকালীন ডা. মনিরুজ্জামান একটি অফিস আদেশ জারি করেন। ২৬ নভেম্বর ২০২২ তারিখে জারি করা ওই আদেশে (স্মারক নং: ইউএইচসি/গৌর/বরি/২০২২/১০৯৯) বলা হয়, আগামী ২৫ নভেম্বর ২০২২ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিতব্য স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)-এর ৫ম জাতীয় মহাসম্মেলনে হাসপাতাল, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কর্মরত সকল চিকিৎসককে হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখে বাধ্যতামূলক উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বাচিপ তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের একটি সংগঠন হিসেবে পরিচিত ছিল।
একাধীক সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী, ও বরিশালের এমপি আবুল হাসানাত আব্দুুল্লাহর ঘনিষ্টজন হিসাবে ডা. মো: মনিরুজ্জামান প্রভাব বিস্তার করতেন। স্থানীয় একাধিক সূত্র মনে করছে, তৎকালীন সময়ে সরকারি চিকিৎসকদের দলীয় ঘরানার সংগঠনের কর্মসূচিতে বাধ্যতামূলকভাবে অংশ নিতে নির্দেশ দেওয়ার এই প্রবণতা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। তবে বিষয়টি নিয়ে ডা. মনিরুজ্জামানের সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তবে সচিবের এই ব্যাখ্যার পরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে যাঁর বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হয়ে মহাসড়ক অবরোধ পর্যন্ত গড়িয়েছিল, সেই কর্মকর্তাকে কীভাবে জেলার সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য প্রশাসনিক পদে পদায়ন করা হলো। স্থানীয় সচেতন মহল “অভিযুক্তকে পুরস্কৃত করা” হিসেবে অভিহিত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গৌরনদীর আন্দোলনকারীরা ইতিমধ্যে সতর্ক করেছিলেন, প্রয়োজনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় ঘেরাও করা হবে। নতুন এই পদায়নের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে ফের আন্দোলন দানা বাঁধার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত কী ধরনের “বিভাগীয় ব্যবস্থা” নেয়, তা এখন দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

42 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন