বরিশাল এলজিইডিতে নির্বাহী প্রকৌশলী বদলি ঘিরে তোলপাড় আল ইমরানের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ, দায়িত্ব বুঝে নিতে বরিশালে রাসেক খান

আপডেট: October 13, 2026

স্টাফ রিপোর্টার,ঃঃ বরিশাল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আল ইমরানকে ঘিরে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ঘুষ-দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের মধ্যে ১১ অক্টোবর তাঁকে বদলি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাঁর স্থলে মোহাম্মদ রাসেক খানকে পদায়ন করা হয়েছে। তবে বদলির আদেশের পরও দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে জটিলতার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেক খান প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষরিত আদেশ নিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় বরিশাল এলজিইডি কার্যালয়ে উপস্থিত হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আল ইমরানের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তদন্তে অভিযোগগুলোর কী কী অংশ প্রমাণিত হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে তাঁর বদলির ঘটনাটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিল ছাড়, কমিশন ও জরিমানা মওকুফের নামে অর্থ দাবির অভিযোগ
বরিশাল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আল ইমরানের বিরুদ্ধে চলমান ও সম্পন্ন সড়ক এবং সেতুর বিল ছাড়, কার্যাদেশ প্রদান, সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন ও জরিমানা মওকুফের ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দাবি করার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরিমানা মওকুফের নামে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা এবং বিল প্রদানের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১ শতাংশ কমিশন এবং সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের জন্য চাহিদা অনুযায়ী অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদারের অভিযোগ, একটি সংশোধিত প্রকল্পের প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর ক্ষেত্রে তাঁর কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়েছিল। অন্য এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের অভিযোগ, কাজের সাইট পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা তুলে ধরে অর্থ আদায়ের চাপ সৃষ্টি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিল, আর্থিক লেনদেনের নথি এবং তদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে না আসায় অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অফিস সহকারীকে ঘিরেও বিতর্ক
নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. এনামুল হককে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারদের দাবি, বিল ও কার্যাদেশ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হতো। তাঁর মাধ্যমে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ মে এলজিইডির বরিশাল অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ মো. জামাল উদ্দিনের স্বাক্ষরে এনামুল হককে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা এলজিইডিতে বদলির আদেশ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সময়ে বরিশাল সদর উপজেলা এলজিইডি থেকে রেহেনা আখতারকে বরিশাল জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বদলির আদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আল ইমরান এর আগে বলেছিলেন, তিনি ঢাকায় কথা বলে কাজ করছেন। তবে বদলি-সংক্রান্ত আদেশ অমান্যের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া প্রয়োজন।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
এর আগে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আল ইমরানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এলজিইডির প্রধান কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২৫৯০ নম্বর স্মারকে প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেনের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে কমিটি গঠন করা হয় বলে জানা গেছে।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয় এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের মানবসম্পদ, পরিবেশ ও জেন্ডার বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ছয়ফুদ্দিনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রহমত-ই-খুদা এবং বরিশাল অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর-উস-শামস।
আদেশে সরেজমিন তদন্ত করে মতামতসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
তবে এ তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হয়েছে এবং বদলির আদেশের সঙ্গে তদন্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি যাচাই প্রয়োজন।
বদলি ঠেকাতে দৌড়ঝাঁপের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলির খবর পাওয়ার পর মোহাম্মদ আল ইমরান আদেশটি পুনর্বিবেচনা বা স্থগিত করার জন্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছেন। একই সঙ্গে নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেক খানের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই তিনি ঢাকায় গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের স্বাক্ষরিত আদেশ নিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় বরিশাল এলজিইডি কার্যালয়ে উপস্থিত হন মোহাম্মদ রাসেক খান। তাঁর উপস্থিতির পর দায়িত্ব হস্তান্তর ও নতুন প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে কার্যালয়টিতে আলোচনা শুরু হয়।
কী বলছেন আল ইমরান
এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আল ইমরান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, “আমি আমার কার্যালয়কে পরিষ্কার করতেছি।”
বরিশাল অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর আদেশের বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমি ঢাকায় কথা বলে কাজ করছি।”
তবে ১১ অক্টোবরের বদলির আদেশ, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেক খানের যোগদান নিয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে আল ইমরানের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রশাসনিক পদক্ষেপের অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা
বরিশাল এলজিইডিতে ঠিকাদারি কাজের বিল, কার্যাদেশ, প্রকল্প অনুমোদন ও কমিশন-সংক্রান্ত অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাঁদের অভিযোগ, এসব অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না হলে সরকারি উন্নয়নকাজের গুণগত মান এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি নথি যাচাই এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের ফল প্রকাশ এবং নতুন নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
এখন দেখার বিষয়, আল ইমরানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে কী সিদ্ধান্ত আসে এবং বরিশাল এলজিইডির প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেক খানের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক হয়।

42 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন