বরিশাল হিজলার নাকে খত, মেহেন্দিগঞ্জে ইকোপার্ক-(পর্ব ৩)

Friday, June 19th, 2020

সাইফুল ইসলাম :; বরিশাল জেলার বিচ্ছিন্ন জনপদ হিজলা উপজেলার হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়নের চর মেঘায় ১৩ মার্চ ২০১৭ সালে আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে বরিশালের সাবেক ডিসি গাজি সাইফুজ্জামান উদ্বোধন করলেন ইকোপার্ক কাম অর্থনৈতিক জোন।

নয়নাভিরাম বিশাল চরে স্থাপন হতে যাচ্ছেল অর্থনৈতিক জোন। প্রায় ২ হাজার ২ শত ৬০ একর জমিতে নিজ হাতে গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে এ কাজের শুভ সূচনা করেন ডিসি গাজি সাইফুজ্জামান। নাকে খত হিজলাবাসীর, হিজলার রাজনীতিবিদদের।

চারদিকে মেঘনা নদী, মাঝখানে বিশাল চর “চরমেঘা”। এ চরেই বসতে যাচ্ছে ভাবী বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় বাণিজ্য কেন্দ্র। পূর্বপাকিস্তান আমলে এ আঞ্চলের অনেক নামডাক থাকলেও পরবর্তীতে এটি তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে। কালের বিবর্তে হারিয়ে গেছে সব। কাহালির হাট-হিজলা বাজার একসময় এর নাম ছিল দেশ-বিদেশ জোড়া। এখন মেঘনার চর নামেই চেনা যায়। কাহালির হাট-হিজলার পুরোনো বন্দর। এর গুরুত্ব কতটুকু তা বোঝা যায় ফাতেমা জিন্নার ভোট প্রচারণার ক্ষেত্রে। একসময় ফাতেমা জিন্না স্টিমারে চড়ে ভোটের জন্য এসেছিলেন এই হিজলায়। স¤্রাট ৮ম জর্জ এ হিজলায় আগমন করেন ১৯১১ সালে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েন হিজলায়। পর্তুগিজ মগ তাড়াতে দুর্গ তৈরী হয় এ হিজলায়। তা আজ শত বছর পর স্মৃতি আর স্মৃতিই রয়ে গেছে। হিজলা হারিয়েছে অনেক ঐতিহ্য, ইতিহাস।
ফারাক্কা বাঁধ আর পরিবেশগত কারণে এটি এখন মেঘনা মোহনার দ্বীপ। উজ্জ্বল কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য অভয়ারণ্য এবং মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভাবনাময় অঞ্চল। কৃষি ক্ষেত্রে হিজলার ভূমিকা অনেক। এ অঞ্চলের সয়াবিন সারা বাংলায় বিস্তৃত। উত্তর দিকে চাঁদপুর, ষাটনল,কুমিল্লা,নোয়াখালী বেয়ে পূর্ব পশ্চিম কোণে হিজলা উপজেলা, উত্তর পূর্ব কোণে মজুচৌধুরীর হাট, দক্ষিণ দিকে ভোলার ইলিশা ঘাট। একটু দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হলে পায়রা সমুদ্র বন্দর। অর্থনৈতিক ভাবে এই অঞ্চল এখন অনেক গুরুত্ব বহন করে। প্রস্তাবিত হিজলার “মেঘা” অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে নদীপথে ঢাকা-চাঁদপুরের দুরত্ব মাত্র ১ থেকে ২ ঘণ্টা। কুমিল্লা হয়ে এর দূরত্ব সড়ক পথে আরও কম। পায়রা বা চট্টগ্রাম যেতে নদীপথে এখানে অনেকটা সহজ। বাংলাদেশের মানচিত্রে হিজলা উপজেলা যেন হৃৎতপি-। একে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন অনেকটাই ব্যর্থ।

 

বিভিন্ন সুযোগসুবিধা সম্বলিত এ ইকোপার্কটি প্রতিষ্ঠা কালে হিজলা উপজেলার নাম থাকলেও সেটি পরবর্তীতে মেহেন্দিগঞ্জের নাম চলে আসছে বলে দাবি করলেন সভার আমন্ত্রিত অতিথি এমপি পংকজ নাথ। খত আর ক্ষতচিহ্ন নিয়েই শান্ত, ক্ষান্ত হিজলাবাসী।
স্বাধীনতা পরবর্তী হিজলার জনপদে পদে পদে বাধা। ক্ষতবিক্ষত হিজলা। ১৯৮৮ সালের দিকে উপজেলার মানচিত্র থেকে প্রথমেই কেটে যায় হিজলা উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের আমজাদ উকিল, আ ট ম মাহাবুব আলম, মাওলানা আবুল হাশেম মোঃ বশির উল্লাহ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। সেটি পরবর্তীতে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার ১৩ নং ইউনিয়ন পরিষদে ¯’ান পায়। এরপর ১৯৯০-১৯৯১ সালের দিকে হিজলা উপজেলার মানচিত্রে আর একবার আঘাত হানে।

আয়লার মতো ছিঁড়ে যায় হিজলার মানচিত্রটি। কুচাইপট্টি নামক একটি ইউনিয়ন সটকে পড়ে এবং যুক্ত হয় পার্শ্ববর্তী শরিয়তপুর জেলার ঘোসাইর হাট উপজেলার সাথে। সেখানে ২২টি মৌজাসহ ঐ ইউনিয়নটি হিজলার মানচিত্র থেকে চির বিদায় নেয়। সর্ব শেষ ১৩ মার্চ ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসক গাজি সাইফুজ্জামান, হিজলা মেহেন্দিগঞ্জ আসনের এমপি পংকজ নাথ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আহসান হাবিব,অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন, হিজলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুজাফর রাশেদ, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান (হিজলা), বড়জালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান পন্ডিত শাহাবুদ্দিন আহম্মেদ, গবিন্দপুর ইউপি চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন সহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হিজলা – মেহেন্দিঞ্জের অফিসারগণ শুভ সূচনা করেন হিজলার চর মেঘার ইকোপার্কের। বর্তমানে এখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করারও প্রক্রিয়া চলছে বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্র দাবি করছে।

৫২টি মৌজার সমন্বয়ে গঠিত হিজলাগৌরব্দী ইউনিয়ন। গৌরব আর বেশিদিন টেকসই হলো না বলে আক্ষেপ হিজলাগৌরব্দীবাসীসহ হিজলার জনগণের। সভা¯’লেই জানা গেল স্থানটি মেহেন্দিগঞ্জের গবিন্দপুরের অংশ। অনেকের প্রশ্ন – এ কী হলো ! হিজলা কেমনে মেহেন্দিগঞ্জ হয় !
সর্বশেষ ২০২০ সালের জুন মাসে জানা গেল হিজলা উপজেলার হিজলাগৌরব্দীর ৪টি মৌজা মেঘা, চরমেঘা,জোয়ারখালি, চরভুলা কেটে নিয়ে গবিন্দপুর ইউনিয়ন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়ে। নাকে খত দেয়া হয় হিজলাকে-হিজলাবাসীকে।

বন্ধ্যাত্বের কাতারে হিজলা উপজেলার রাজনীতিবিদগণ। মৌজা কাটা বিষয়ে আলাপ হয় তৎকালীন উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মামুন হোসেন-এর সাথে। তিনি জানান, “আমি জানি, চরমেঘা মৌজা হিজলার এবং এখনও হিজলার। তবে কিভাবে তারা গেজেট করল তা বোধগম্য নয়”। ঐ সময়কার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান জানান, “কাগজপত্র ঘেটে যা দেখলাম, এটি হিজলার। তবে তাদের দাবি এখনও বুঝতে পারছি না”। একই প্রশ্ন হিজলা উপজেলার সাবেক নির্বাহী অফিসার আহসান হাবিব এবং আবুজাফর রাশেদ -এর।

২০২০ সালের জুন মাস। এ মাসেই আবার নতুন করে গেজেট প্রকাশিত হয়। ৪ মৌজা মেহেন্দিগঞ্জের গোবিন্দপুরের। শব্দহীন বাজ্রাঘাত হিজলাবাসীর মাথায়। হিজলার ৬ ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যন, ভাইস চেয়ারম্যানদ্বয় জানান, এ বিষয়ে কিছুই জানেনা তাঁরা।