২৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

কক্সবাজারে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারক কামাল হোসেন চৌধুরী

আপডেট: মার্চ ২৬, ২০২২

আনোয়ার হাসান চৌধুরী, কক্সবাজার:; বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রতিটি জেলার ন্যায় কক্সবাজার জেলার মুক্তিসেনারাও ৭১’র রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আজ ২৬শে মার্চ। কক্সবাজারের মাটিতে ৭১ সালের এদিন ভোর ৬টায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মাইকযোগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর, জয় বাংলা বাহিনী’৭১ এর প্রধান, তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি, বর্ষীয়ান জননেতা জনাব কামাল হোসেন চৌধুরী এবং এরই সাথে সারা শহর কেঁপে উঠে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ জাতীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য, বাংলাদেশ যুবলীগ ও কৃষকলীগের প্রাক্তন প্রেসিডিয়াম মেম্বার, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের প্রাক্তন সহ-সভাপতি, বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জেলা ছাত্রলীগ ও সদর আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জেলা আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সফল আহবায়ক, জেলা কৃষকলীগের প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক ও সাধারণ সম্পাদক জনাব কামাল হোসেন চৌধুরীর স্মরণাপন্ন হয়ে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিস্মরণীয় স্মৃতি গাঁথা জানতে চাইলে তিনি জানান, ১৯৭১ এর ৩রা মার্চ কক্সবাজারে হাজারো ছাত্রজনতা প্রতিবাদ মিছিল করে। যে মিছিলের অগ্রভাগে ছিলাম আমি স্বয়ং, সর্বপ্রয়াত জয় বাংলা বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড মোজাম্মেল হক (ডা. আবুলের ছেলে), নজরুল ইসলাম, ছুরত আলম, জহির, ওমর, জালাল, হাবীব, রাজা মিয়া, মুজিব প্রমুখ।
মিছিলটি এসডিও অফিসের সামনে এলে তাৎক্ষণিক আমার নির্দেশে মোজাম্মেল এর কাঁধের উপর ছুরত আলম, তার উপর আল মামুন, ওদিকে পানির পাইপ দিয়ে মুজিব ও মনসুর উঠে মহকুমা প্রশাসন অফিসের পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে পাবলিক লাইব্রেরীর কোণায় আমতলা স্টেজে নিয়ে আসে। তখন মাইকে আমি ঘোষনা করি, এই পতাকার নাম দিয়ে আমাদেরকে ২২/২৩ বৎসর শোষন করেছে। এর আর দরকার নাই। এর সাথে সাথে পতাকায় আগুন ধরিয়ে দেয় মনসুর, আল মামুন, সুনীল, জহির প্রমুখ। সাথে সাথে হাজারো ছাত্রজনতা বজ্রকন্ঠে স্লোগান দেয়, “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু”।
জেলার সর্বপ্রথম অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামাল হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, ৭১’র প্রথম দিক থেকেই আমরা গোপনে হোটেল সায়মনে ৩টি রুম নিয়ে অফিস করতে থাকি এবং ভয়েস অব আমেরিকা, বি.বি.সি, আকাশবাণী ও টেলিফোনযোগে সংবাদের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করি। ৭ই মার্চের অগ্নিঝরা ভাষনের নির্দেশনা সমূহ অনুসরণ করি এবং সেই ভাষণের মর্মবানী আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে।
আমরা বুঝতে পারলাম যে, আমাদেরকে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। তখন থেকে আমরা ২৪/২৫ জন সিনিয়র ছাত্র রাজনৈতিক নেতাকর্মী হোটেল সায়মনে অঘোষিত ক্যাম্প শুরু করি। ৮ই মার্চ পাবলিক লাইব্রেরীর মাঠে আমার নেতৃত্বে জয় বাংলা বাহিনী গঠিত হয় এবং ১০/১১ মার্চ হতে পিটিআই হোস্টেল মাঠ, প্রিপার‍্যাটরি মাঠ ও জেলা স্টেডিয়ামে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করি। ২৫শে মার্চ আনুমানিক রাত ১টার পর কক্সবাজার বীচ রেষ্ট হাউস থেকে আমরা কয়েকজনের উপস্হিতিতে আমি চট্টগ্রাম রেস্ট হাউসে সিটি আওয়ামীলীগ অফিসে জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে ফোন করি। ফোন ধরেন শ্রমিক নেতা জামাল। তার কাছে আমি পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি বলেন, দেশে গণহত্যা চলছে, রাজারবাগ ই-পি.আর বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপর আক্রমন হয়েছে। আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন। এখন চতুর্দিকে গোলাগুলি হচ্ছে। আমরা নিরাপদ স্থানের জন্য প্রস্ততি নিচ্ছি। আপনারা প্রস্তুতি নেন। আমি রিসিভারে এখান থেকেই গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরে ইপিআর ওয়্যারলেস অপারেটর জোনাব আলীর কাছে হালিশহর থেকে আসা ক্যাপ্টেন রফিক-এর ম্যাসেজ এবং অবাঙ্গালী ক্লোজ করার ব্যাপারে জানি। এ কথা আমরা স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দকে জানালাম।
২৬শে মার্চ ভোর ৬টায় আমি কক্সবাজার শহরের অলিতে-গলিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মাইকে ঘোষণা করেছিলাম যে, “আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ তারিখ রাত্রে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। একথা আমরা বিশ্বস্থ সূত্রে জেনেছি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়নগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় পশ্চিমা লাল কুত্তাদের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ঢাকায় পুলিশ ক্যাম্প, ই.পি.আর ক্যাম্প এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র এবং ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা চালিয়েছে। সুতরাং আমাদের আর সময় নাই। কক্সবাজারবাসী সংগ্রামী বাঙ্গালীরা যে যেখানে যেভাবে আছেন, অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে সরাসরি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান”। পরবর্তীতে এই ঘোষণা শহরব্যাপী প্রচার করেন মোজাম্মেল হক, জহির, ছুরত আলম ও মুজিব।

368 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন