৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার

বরিশালের চন্দ্রমোহনে এলজিইডির সড়ক প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ,নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ার আগেই ভেঙ্গে  পড়ছে প্যালাসাইডিং

আপডেট: জুন ২, ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার ঃঃ  বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন থেকে ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট পর্যন্ত সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, যথাযথ তদারকির অভাব এবং প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে প্রায় ৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিদর্শন প্রতিবেদনে সড়কটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—প্রোটেকশন ওয়ার্ক বা প্যালাসাইডিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

চন্দ্রমোহন মাছ বাজার এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কের প্যালাসাইডিং ও সুরক্ষা কাঠামো নির্মাণে একাধিক অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, ঘানিব্যাগ তৈরিতে নির্ধারিত অনুপাতে বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি। ফলে বস্তাগুলো শক্ত হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, কিছু স্থানে বস্তার ভেতরে সহজেই লাঠি প্রবেশ করানো সম্ভব হচ্ছে, যা নির্মাণমান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এছাড়া খালের ভেতর থেকে ভারী যন্ত্র দিয়ে কাদামাটি উত্তোলন করে সড়কের পাশে ফেলার কারণে প্যালাসাইডিংয়ের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ১৪০ মিটার এলাকায় প্যালাসাইডিং খালের দিকে হেলে পড়েছে।

তাদের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে পুরো কাঠামো ধসে পড়তে পারে এবং সড়কটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব রয়েছে। একইসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের অভিযোগও তুলেছেন তারা।

অভিযোগের তীর গেছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীর দিকেও। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।গত ১ জুন প্রকল্প পরিচালকের কাছে জমা দেওয়া এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বরিশালের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ মো. জামাল প্রকল্পটির নকশা ও প্রোটেকশন ওয়ার্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প এর আওতায় সড়কটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। খরস্রোতা খালের পাড়ঘেঁষে নির্মাণাধীন হওয়ায় সড়কের একপাশে আরসিসি প্যালাসাইডিং নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ১:৪:৮ অনুপাতে প্রস্তুত বালিভর্তি বস্তা ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালের পানির উচ্চতার পরিবর্তনের কারণে এখানে সক্রিয়  ও নিষ্ক্রিয় চাপের মাত্রা পরিবর্তনশীল। বর্ষা মৌসুমে এই চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফলে বিদ্যমান প্যালাসাইডিং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সড়কের মূল অংশের সাবগ্রেড, সাববেইজ, বেইজ ও কার্পেটিংয়ের কাজ তখনও শুরু হয়নি। একইসঙ্গে কান্ট্রি-সাইডের মাটির কাজও অসম্পূর্ণ ছিল।

পরিদর্শন শেষে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মন্তব্য করেন:

“সম্ভবত সড়কটির প্যালাসাইডিং স্থায়ী হবে না, অথচ এই অংশটিই সড়কের স্থায়িত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি আরও মত দেন যে, প্রোটেকশন ওয়ার্কের বিষয়ে ডিজাইন ইউনিটের কারিগরি পরামর্শ অনুযায়ী প্রাক্কলন প্রস্তুত করা প্রয়োজন ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রায় পুরো ব্যয়ের বড় অংশই প্রোটেকশন ওয়ার্কে ব্যয় হচ্ছে। তাই সড়কের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সুরক্ষা কাঠামোর কার্যকারিতা এবং নকশাগত সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।এছাড়া কান্ট্রি-সাইডের কয়েকটি অংশে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একটি ছোট ড্রেনেজ কালভার্ট নির্মাণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হিসেবে প্রোটেকশন ওয়ার্কের স্থায়িত্ব যাচাইয়ের জন্য এলজিইডির ডিজাইন ইউনিট এবং প্রকল্প পরিচালকের সরেজমিন পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। বরং অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সরকারি অর্থের অপচয় এবং জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

78 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন