২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

ক্ষমতার প্রভাবে গা ছাড়া বরিশাল আওয়ামী লীগ

আপডেট: জুন ২৮, ২০১৯

উম্মে রুম্মান :
বরিশাল মহানগরীতে আওয়ামী লীগ দৃশ্যত ঐক্যবদ্ধ হলেও ভেতরে ভেতরে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। ক্ষমতার প্রভাবে অনেকটা গা ছাড়া হয়ে পড়েছেন দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে টানা তিনবার ক্ষমতায় আসা দলের কোনো কোনো নেতা আত্ম-অহমিকায় ভুগতে শুরু করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের ‘একলা চলো’ নীতির কারণে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো তাদের বিরুদ্ধে ‘অবমূল্যায়ন’ ও ‘অবহেলার’ অভিযোগ আনতে শুরু করেছে। তাদের সখ্যেও ভাটা পড়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বরিশালে মূল দলের সাংগঠনিক শক্তি খানিকটা মজবুত হলেও আওয়ামী লীগের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর অবস্থা বেশ নাজুক। মহানগর শাখার এক নেতার একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে এসব সংগঠন স্বাধীনভাবে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে পারছে না। সাংগঠনিকভাবেও শক্তিশালী হতে পারছে না। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জানান, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা না থাকাই এর প্রধান কারণ। নগরে আট বছর ধরে নেই মহানগর ছাত্রলীগ। নগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল ১৫ বছর আগে। স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও একই অবস্থা। নগর শ্রমিক লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি থাকলেও সভাপতি সংগঠনে নিষ্ফ্ক্রিয়।
মেয়রকে ঘিরে নগরের রাজনীতি :২০১৬ সালের অক্টোবরে গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলালকে সভাপতি এবং কে এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়।
এ কমিটিতে ৯ জন সহসভাপতি ও তিনজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রয়েছেন। ৩ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। অভিযোগ আছে, সাদিক আবদুল্লাহই এখন নগর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রক। এ নিয়ে অনেকের মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও মুখ ফুটে কেউ কিছুই বলছেন না।
২০১৮ সালের ৩০ জুলাই বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর সাদিক আবদুল্লাহ নগর আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী ভ্রাতৃপ্রতিম বিভিন্ন সংগঠনে একক আধিপত্য বিস্তারের পথে হাঁটছেন।
মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ অবশ্য বলেন, নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পর মহানগর আওয়ামী লীগকে তিনিই সুসংগঠিত করেছেন। নগর নেতারা ভালোবাসেন বলেই যে কোনো সুবিধা-অসুবিধায় তার কাছেই আসেন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নেতাকর্মীদের এ আসা-যাওয়া আরও বেড়েছে। দলে কোনো রকম প্রভাবই খাটান না বলে জানান তিনি।
বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগ অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত। গত জাতীয় ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নগর আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে কিছু সুবিধাবাদী লোকজন দলে ঢুকে ত্যাগী নেতাদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। এ ব্যাপারেও নগর আওয়ামী লীগ সতর্ক রয়েছে।
সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে গোলাম আব্বাস দুলাল বলেন, এ পর্যন্ত মহানগরীর ৯টি ওয়ার্ডে দলের সম্মেলন করে নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে। বাকি ওয়ার্ডগুলোতেও সম্মেলন ও কমিটি দেওয়া হবে। সদস্য সংগ্রহ অভিযান কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
গোলাম আব্বাস চৌধুরী অবশ্য স্বীকার করেছেন, নগর আওয়ামী লীগের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো স্থবির হয়ে আছে। তবে দলীয় কর্মসূচিগুলোতে এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিয়মিত অংশ নেন। সম্প্রতি মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটি কেন্দ্রে জমা দেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি ঘটেনি।
মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে দলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ নাকচ করে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম জাহাঙ্গীর বলেন, সাদিক আবদুল্লাহ রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তিনি সিটি করপোরেশনের মেয়র। সঙ্গত কারণেই দলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। তাই কেউ কেউ মুখরোচক কথা বলছেন মাত্র।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মাঠে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় আওয়ামী লীগ নেতারা অনেকটা গা ভাসিয়ে রাজনীতি করছেন। এটা দলের জন্য শুভলক্ষণ নয়। বারবার সহযোগী সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি করার চেষ্টা করা হলেও কেন্দ্রের অসহযোগিতার কারণে তা সফল হয়নি বলেও দাবি করেন নগর আওয়ামী লীগের এই নেতা।
ক্ষুব্ধ ১৪ দলীয় শরিকরা :বরিশাল মহানগরীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক দলগুলোর মধ্যে কার্যক্রম আছে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও ন্যাপের। জাতীয় সংসদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর এ তিনটি দলের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না স্থানীয় আওয়ামী লীগের। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ তিন দলের শীর্ষ নেতাই বলেছেন, নির্বাচন এলে আওয়ামী লীগ তাদের ডাকলেও পরে আর মনে রাখে না। তবে সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখাসহ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে প্রতিরোধ করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের উচিত ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত সাংগঠনিক যোগাযোগ রাখা।
বরিশাল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল হক মৃধা বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির টিপু সুলতান ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পেলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধিতায় হেরে যান। অর্থাৎ শেখ হাসিনার মনোনীত নৌকার প্রার্থীরও বিরোধিতা করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এ কারণে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতাকর্মীদের ক্ষোভ রয়েছে আওয়ামী লীগের ওপর। তা ছাড়া জাতীয় ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির কোনো সাংগঠনিক যোগাযোগও নেই।
বরিশাল জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল হাই মাহবুব বলেন, ১৪ দল গঠিত হয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করতে। কিন্তু এখন আর সে লক্ষ্যপূরণে কোনো কার্যক্রম নেই। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের পর বরিশালে ১৪ দলের ঐক্যবদ্ধ কোনো কার্যক্রমও নেই। অথচ প্রতিপক্ষ নানাভাবে সংগঠিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের উচিত শরিকদের সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকা, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে প্রতিরোধ করা এবং উন্নয়নের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা।
জেলা ন্যাপ শাখার সভাপতি দাশগুপ্ত আশীষ কুমার বলেন, বরিশালে ১৪ দল নামে আছে, কাজে নেই। এ জোটকে সক্রিয় রাখার প্রধান দায়িত্ব আওয়ামী লীগের হলেও তারা সে দায়িত্ব পালন করে না। এ সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তথা বিএনপির উত্থান ঘটলে মহাবিপর্যয় নেমে আসবে।
সহযোগী সংগঠনগুলো বেহাল অবস্থায় :আওয়ামী লীগের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যক্রম বরিশালে নেই বললেই চলে। ২০০৪ সালে ৫৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করার পর বরিশালে মহানগর যুবলীগের আর কোনো কমিটি হয়নি। চরম নেতৃত্বশূন্যতা বিরাজ করছে এ সংগঠনে। আবার নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে যুবলীগের কমিটি নেই। নামমাত্র যে ক’জন নেতা সংগঠনে সক্রিয় আছেন, তাদের মধ্যেও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থাকায় এটি এখন কাগুজে সংগঠনে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ আছে, পদ-পদবি নেই এমন কয়েকজন নেতা নগর যুবলীগের নাম ভাঙিয়ে দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন।
এ প্রসঙ্গে নগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীন সিকদার বলেন, নগর যুবলীগের কমিটি ১৫ বছরের পুরনো। তাই অনেকেই সংগঠনে সক্রিয় নন। কেউ কেউ বরিশালে থাকেনও না। তবে দলীয় কর্মসূচি নিয়মিতই পালন করা হয়।
এদিকে ছাত্রলীগেরও একই অবস্থা। ২০১১ সালের ১০ জুলাই জসিম উদ্দিনকে সভাপতি, অসীম দেওয়ানকে সাধারণ সম্পাদক ও তৌসিক আহম্মেদকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের দু’বছর মেয়াদি কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এই তিন নেতাকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হলেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আট বছরেও তা দিতে পারেননি তারা। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ান এক ছাত্রীকে অপহরণ করে জেলে গেলে তাকে সংগঠন থেকে বহিস্কৃত করা হয়। সাংগঠনিক সম্পাদক তৌসিক আহম্মেদ রাহাদ চাকরি করছেন। সবেধন নীলমণি বলতে রয়েছেন শুধু সভাপতি জসিম উদ্দিন। নগরীর বেশিরভাগ ওয়ার্ডে ছাত্রলীগের কমিটিও নেই। এমনকি নগরীর পাঁচটি কলেজেও অস্তিত্ব নেই সংগঠনের।
মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয় ১৬ বছর আগে, ২০০৩ সালে। নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে এ সংগঠনের অস্তিত্বও নেই। তবে ১৬ বছর আগের কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মোয়াজ্জেম হোসেন ফিরোজের দাবি, ২০টির বেশি ওয়ার্ডে তাদের কমিটি রয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় এ সংগঠন সর্বশক্তি নিয়ে কাজ করেছে। নতুন কমিটি করার জন্য সম্মেলনের তারিখ চেয়ে কেন্দ্রে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
মহানগর শ্রমিক লীগের ৫৫ সদস্যের কমিটি গঠিত হয় ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তবে নগর শ্রমিক লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন সংগঠনের কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। সর্বশেষ মে দিবসেও কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি তিনি। আফতাব অভিযোগ করেন, সিটি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ তাকে না জানিয়ে নগর শ্রমিক লীগের সভা ডাকেন, যা কর্মীরা তাকে জানান। এ অবস্থায় দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় স্বেচ্ছায় সংগঠন থেকে দূরে থাকছেন তিনি।
অবশ্য আফতাবের এ অভিযোগ ঠিক নয় দাবি করে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কে এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, তিনি হয়তো ব্যক্তিগত কারণে রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। নগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিমল দাস বলেন, নগর শ্রমিক লীগের বেশিরভাগ নেতাকর্মীই সংগঠনে সক্রিয় আছেন। তবে সভাপতি কেন সক্রিয় নন, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

169 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন