বরিশালে ডিবির বিরুদ্ধে ‘আটক বাণিজ্যের’অভিযোগ টাকা দিলে মুক্তি,না দিলে মাদক-অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ

আপডেট: September 18, 2026

এস.এন.পলাশ,বিশেষ সংবাদদাতাঃঃ বরিশালের আগৈলঝাড়ায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সাধারণ মানুষকে আটক, পরে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে মাদক বা অস্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া এক যুবককে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটি স্থানে ১০১ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার দেখিয়ে মামলা দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়া ও আশপাশের এলাকায় ডিবির এসআই আফজাল ও এএসআই রাজিব পালের নেতৃত্বে নিয়মিতভাবে এ ধরনের হয়রানি চলছে। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খামারিদের কাছ থেকেও মাসিক টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে অস্ত্র-মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এসব অভিযোগের তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা জাফর হাওলাদার।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১১ আগস্ট রাতে মোল্লাপাড়ায় জাফর হাওলাদারের বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশের একটি দল। এ সময় জাফর হাওলাদারের ছেলে নাদিম, প্রতিবেশী সাব্বির ও সোহাগকে আটক করা হয়। এর আগে সাহেবের হাট বাজার এলাকা থেকে নয়ন ঢালী এবং ভদ্রপাড়া এলাকা থেকে সাহিন সরদার নামে দুজনকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে সেখানে নিয়ে আসা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
জাফর হাওলাদারের অভিযোগ, ওই পাঁচজনকে আটকের পর নাদিমকে ছেড়ে দিতে ২ লাখ টাকা এবং অন্যদের প্রত্যেকের কাছে ৩০ হাজার টাকা করে দাবি করা হয়। পরে টাকা দিতে না পারায় নাদিমকে ১০১ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার দেখিয়ে গৌরনদীর মাহিলাড়া এলাকার একটি মামলায় আদালতে পাঠানো হয়।
তবে পুলিশের কথিত সোর্স হিসেবে পরিচিত নয়ন ঢালী দাবি করেন, ওই রাতে তার কাছে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। তার ভাষ্য, সাহেবের হাট থেকে তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে মোল্লাপাড়ায় জাফর হাওলাদারের বাড়িতে নেওয়া হয়। তার পকেট থেকে ১২ হাজার টাকা নেওয়া হয় এবং পরে আরও ২ হাজার টাকা বিকাশে পাঠানো হয় বলে দাবি করেন তিনি।
নয়ন আরও বলেন, নাদিমের কাছ থেকে ১০১ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা তিনি দেখেননি।
‘বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেল, মামলায় ঘটনাস্থল মাহিলাড়া’
ওই মামলার এক নম্বর সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা লাল মিয়া বলেন, রাত ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার সময় জাফর হাওলাদারের বাড়ির সামনে কয়েকজনকে দেখে তিনি এগিয়ে যান। সেখানে নাদিমসহ পাঁচজনকে আটক অবস্থায় দেখতে পান।
লাল মিয়ার দাবি, পরে সাব্বির ও সোহাগের পরিবারের লোকজন ধারদেনা করে ৩০ হাজার টাকা করে দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নেন। ওই রাতে ডিবি সদস্যরা তাদের জানিয়েছিলেন, মুরগির খামারি কাওছারকে ধরতে তারা সেখানে এসেছেন। নাদিম কাওছারকে চেনেন—এমন কারণেই তাকে আটক করা হয়েছে বলেও পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে মামলার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে লাল মিয়া বলেন, নাদিমকে তিনি মোল্লাপাড়া থেকে আটক হতে দেখেছেন। অথচ মামলায় তাকে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া থেকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তার দাবি, মোল্লাপাড়া থেকে মাহিলাড়ার দূরত্ব প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার।
তিনি বলেন, একই মামলায় গৌরনদীর আরও দুজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাহলে দুটি পৃথক স্থানের ঘটনাকে কীভাবে একই অভিযানের অংশ হিসেবে দেখানো হলো—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মাসিক টাকা না দিলে ‘অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর’ অভিযোগ
মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা কাওছার হোসেনও ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানি ও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
কাওছারের দাবি, এসআই আফজাল ও এএসআই রাজিব পাল বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে আগে ৫৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে প্রতি মাসে টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে অস্ত্র ও মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কাওছারের আরও অভিযোগ, ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে তার ঘরের বিভিন্ন সামগ্রী, এমনকি গাছের কলাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্কে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানান।
তিনি বলেন, তার ভাইয়ের ছেলে নাদিমকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। ওই রাতে নাদিমকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২ লাখ টাকা দাবি করা হলেও তা দিতে না পারায় তাকে ইয়াবাসহ মামলায় চালান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কাওছার।
‘হয়রানিতে গ্রাম প্রায় জনশূন্য’
ভুক্তভোগী জাফর হাওলাদার বলেন, ওই রাতে তার দুই ছেলেকে আটক করা হয়েছিল। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় এক ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও নাদিমকে নিয়ে যায় ডিবি।
তার অভিযোগ, এসআই আফজাল নাদিমকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরে নাদিমের বিরুদ্ধে ১০১ পিস ইয়াবা উদ্ধারের মামলা দেওয়া হয়।
জাফর হাওলাদারের প্রশ্ন, “আমার ছেলেকে আমার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেল। অথচ মামলায় তাকে মাহিলাড়া থেকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার দেখানো হলো—এটা কীভাবে সম্ভব?”
তিনি আরও বলেন, ডিবি পুলিশের কথিত হয়রানি ও আটক-ছাড়ার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং রেঞ্জ ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। অভিযোগ দেওয়ার পর তাকে আরও মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে যা বলছে পুলিশ
অভিযোগের বিষয়ে এসআই আফজালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আগৈলঝাড়ার মোল্লাপাড়ার ওই ঘটনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া আমি কোনো কথা বলতে পারব না।”
বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, তিনি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এক স্থান থেকে আটক অথচ মামলায় অন্য স্থান দেখানো সম্ভব নয়।” তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দেখা হবে। কোনো পুলিশ সদস্য অপেশাদার আচরণের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগগুলো কতটা সত্য, মামলায় গ্রেফতারের স্থান ও কথিত ঘটনাস্থলের মধ্যে যে পার্থক্যের কথা বলা হচ্ছে তার কারণ কী এবং আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা দাবির অভিযোগের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

14 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন