
আপডেট: নভেম্বর ৪, ২০২১
খান রুবেল :; অনেকটা চমক দেখিয়েই ঘোষণা হলো বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি’র তিনটি ইউনিট কমিটি। দীর্ঘ আলোচনা আর জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বুধবার বিকালে তিনটি ইউনিটের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। ঘোষণা হওয়া নতুন কমিটিতে স্থান হয়নি দক্ষিণাঞ্চলের হাইভোল্টেজ নেতা খ্যাত কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার। এমনকি বাদ পড়েছেন সদ্য সাবেক কমিটির সভাপতি-সম্পাদক। নতুন এবং তৃণমূলকে নিয়ে সাজানো হয়েছে জেলা ও মহানগর বিএনপিকে।
বুধবার ঘোষণা হওয়া বরিশাল মহানগর বিএনপিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে সাবেক কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান ফারুককে। এছাড়া সদস্য সচিব করা হয়েছে তৃনমূলের প্রার্থী এবং সাবেক কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের একাধিকবার নির্বাচিত কাউন্সিলর মীর জাহিদুল কবির জাহিদকে। এ কমিটিতে ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক পদ পেয়েছেন মহানগর বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট আলী হায়দার বাবুল।
এছাড়া বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান নান্টু এবং সদস্য সচিব হয়েছেন মহানগর বিএনপি’র সাবেক সহ-সভাপতি আকতার হোসেন মেবুল।
এছাড়া উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়েছে কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন আগৈলঝাড়া বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মুকুল।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি’র কমিটি গঠনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত এই কমিটিতে আত্ম তৃপ্তি প্রকাশ করেছেন বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে জেলা ও মহানগর বিএনপি রাহুমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সিন্ডিকেট ভেঙে দিবে।
যদিও কেন্দ্র ঘোষিত কমিটি নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার। তার দাবি গুরুত্বপূর্ণ এ তিনটি ইউনিটে যোগ্যতার মূল্যায়ন হয়নি। নতুনরা কতটা যোগ্য সেটা ভবিষ্যত আন্দোলন সংগ্রামেই দেখা যাবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘সবশেষ ২০১০ সালে সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ারকে সভাপতি এবং সাবেক পিপি কামরুল আহসান শাহীনকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা হয়। ওই কমিটির অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর। অনুমোদনের এক বছরের পরেই অর্থাৎ ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান শাহিন। তার মৃত্যুতে ভাগ্য খোলে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন সিকদারের। মহানগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।
অপরদিকে, একইভাবে বরিশাল উত্তর ও দক্ষিণ জেলা কমিটি গঠিত হয়। ২০১৩ সালের নভেম্বরে ঘোষণা হওয়া এ কমিটিতে এবায়দুল হক চাঁনকে সভাপতি ও আবুল কালাম শাহীনকে সাধারণ সম্পাদক এবং উত্তর জেলায় সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ ও আকন কুদ্দুসুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
এদিকে, দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়ায় তিনটি ইউনিটে নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে বাধার সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি জেলা এবং মহানগর বিএনপিতে নেতৃত্ব স্থানীয় নেতাদের গ্রুপিং রাজনীতির কারণে একাধিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েন মূলদল এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এমনকি দলের মূল্যায়ন না পেয়ে অনেকেই রাজনীতি ছেড়ে হাত-পা গুটিয়ে নেন।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন কমিটি গঠনের দাবি তোলেন জেলা ও মহানগর বিএনপি’র তৃনমূল নেতাকর্মীরা। আর এই কমিটিতে সাবেক ছাত্রনেতা এবং ত্যাগি ও যোগ্যদের মূল্যায়ন করে সিন্ডিকেট আর পকেট কমিটি’র প্রথা বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হন নেতাকর্মীরা। এর পর পরই শুরু হয় বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি’র নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়া। কমিটি গঠনের লক্ষ্য নিয়ে দফায় দফায় বরিশাল সফর করেন বিএনপি’র বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় টিম। সবশেষ দীর্ঘ আলোচনা আর প্রতিক্ষার অবসন ঘটিয়ে মঙ্গলবার ঘোষণা হয় বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি’র তিনটি ইউনিট কমিটি।
দলীয় নেতৃবৃন্দ বলছেন, ‘সদ্য ঘোষণা হওয়া কমিটিতে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাডভোকেট বিলকিছ আক্তার জাহান শিরিন, বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন এবং ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাজিব আহসানের অস্তিত্বের জানান পেয়েছে। কেননা নতুন কমিটিতে যাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে তারা সবাই শিরিন ঘরানার রাজনীতি করেন। অবশ্য এর পেছনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা জয়নুল আবেদিন, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের প্রভাব রয়েছে বলে মনে দাবি স্থানীয় নেতাদের।
এদিকে, ঘোষণা হওয়া কমিটিতে মেধাবী এবং যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক মহানগর বিএনপি’র সাবেক ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক খন্দকার আবুল হাসান লিমন। তিনি বলেন, ‘সাবেক ছাত্রনেতাদের নিয়ে কমিটি গঠনের দাবি ছিল আমাদের। কেন্দ্র আমাদের সেই দাবি বাস্তবাছু করেছে। এতে আমরা খুশি এবং আনন্দিত।
তিনি বলেন, ‘যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে বিএনপি’র ভবিষ্যত। তারা যদি সঠিকভাবে চালাতে পারেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে আশা ভরসা নিয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন সেইভাবে দায়িত্ব পালন করলে দল অবশ্যই শক্তিশালী হবে। আমাদের দাবি থাকতে একটাই যারা দলে নিগৃত ছিল, রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা ছিল, মাঠপর্যায়ে রাজনীতিতে ছিল না, তাদের সবাইকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ করে নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দ সকল আন্দোলন সংগ্রাম আর রাজনীতিকে শক্তিশালী করবেন।
নতুন কমিটি প্রসঙ্গে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সদ্য সাবেক সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন বলেন, ‘দল যেটা ভালো মনে করেছে সেটাই করেছে। এ বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। তবে এ কমিটি বিএনপি’র পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে সম্মেলন প্রস্তুতির জন্য আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে।
নতুন কমিটি গঠনমূলক হয়েছে জানিয়ে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিছ আক্তার জাহান শিরিন বলেন, ‘যারা নেতৃত্বে এসেছেন তারা দলের সাথে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত। যারা এসেছেন তারা সবাই সাবেক ছাত্র নেতা। একারণে তাতের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। পুরানো অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কাজ করলে অবশ্যই তারা ভালো করবে। নতুন নেতৃত্বের কারণে নেতাকর্মীরা আলাদাভাবে উৎসহ নিয়ে কাজ করবে। নতুনরা সবাইকে নিয়ে কাজ করতে পারলে অবশ্যই তারা ভালো করবেন বলে আমি আশাবাদী।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগর বিএনপি’র সদ্য সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘দলের হাইকামন্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখানে আমার বলার কিছু নেই। আমি দুবার প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ছিলাম। আন্দোলন সংগ্রামের কারণে শ’খানেক মামলা খেয়েছি। জেল খেটেছি। কিন্তু নতুন কমিটিতে এ বিষয়টি’র মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ ছিলো।
তিনি বলেন, ‘শুধু বরিশাল মহানগর নয়, অন্যা ইউনিটগুলোতেও একইভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যত আন্দোলনের জন্য দলকে যেভাবে শক্তিশালী করা দরকার নতুন কমিটি সেভাবে দেখছি না। কিছু কিছু লোক আছে যারা দলের রাজনীতিতে সক্রিয় নেই। এখন নতুন কমিটির নেতৃত্বে যারা এসেছেন তারা কতটা যোগ্য সেটা ভবিষ্যত আন্দোলন সংগ্রামেই মানুষ দেখতে পাবে।