গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: অসুস্থতা ও চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন ফ্রন্টলাইনার ‘জুলাই যোদ্ধা’ মো. রিয়াজ উদ্দিন

আপডেট: August 17, 2026

খবর বিজ্ঞপ্তি ঃঃ ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আজ দুই বছর পূর্ণ হলো। রাজপথে ছাত্র-জনতার রক্ত, ঘাম আর অসামান্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে আজও শরীর ও মনের দগদগে ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ ‘জুলাই যোদ্ধা’। এই বীর সেনানীদেরই একজন মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ—যিনি কারওয়ান বাজার এলাকার রাজপথের সম্মুখসারির লড়াইয়ে নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন।

আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার মাশুল হিসেবে আজ তিনি হারিয়েছেন তার কর্মসংস্থান। গলায় ১০ ইঞ্চি সেলাই দাগের সার্জারি আর ঘাড়ের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে পরিবার ও অসুস্থ বৃদ্ধ বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আজ তিনি নিজেই চরম অসহায়ত্বের শিকার।

### **রাজপথের সেই উত্তাল দিনগুলো ও নির্মম আঘাত**

সে সময় ফার্মগেটের পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় বসবাস করতেন রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুকফাটা আর্তনাদ ও শহিদ হওয়ার ঘটনা তার চেতনায় গভীর দাগ কাটে। ঘরে বসে থাকতে না পেরে তিনি রাজপথে নেমে পড়েন।
পরবর্তীতে ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি কারওয়ান বাজার এলাকায় জোরালোভাবে যোগ দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সেদিন পুরো এলাকা পরিণত হয়েছিল এক রণক্ষেত্রে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেপরোয়া লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছিল চারপাশ। এর সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সশস্ত্র হামলা আন্দোলন দমনের এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সেই তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মুহূর্তে প্রতিপক্ষের এলোপাতাড়ি হকিস্টিকের বাড়ি সরাসরি আঘাত করে রিয়াজের ডান গলায়। মুহূর্তের মধ্যে তার গলা মারাত্মকভাবে ফুলে ওঠে এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাশাপাশি মুহুর্মুহু টিয়ার গ্যাসের প্রভাবে তার চোখ দুটি ঝলসে লাল হয়ে যায়।

### **চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক বিপর্যয়**

প্রথমে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে টানা দুই মাস তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে “গণঅভ্যুত্থানের জুলাই যোদ্ধা” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিনামূল্যে , চিকিৎসা, ফ্রি টেস্ট, ওষুধ, কেবিন ও উন্নত মানের খাবারের ব্যবস্থা করেছিল।
নিজের শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে রিয়াজ উদ্দিন বলেন:

> *”আমার অপারেশনে গলায় ১০ ইঞ্চি সেলাই দেওয়া হয়েছে। ৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মিলে প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে সার্জারি সম্পন্ন করেন আমার অপারেশনে তখন ২ ব্যাগ রক্তও দিতে হয়েছিল।”*
>
আজ দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আঘাতের ধকল কাটেনি। তিনি স্বাভাবিকভাবে ঘাড় ঘোরাতে পারেন না, কোনো ভারী বস্তু মাথায় বহন করা তার পক্ষে অসম্ভব। এমনকি বিছানা থেকে একা একা ওঠার সময়ও তাকে অন্যের সাহায্য নিতে হয়।

### **বেসরকারি চাকরি হারিয়ে দিশেহারা জীবন**

আন্দোলনে গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকায় রিয়াজ উদ্দিন হারিয়ে ফেলেন তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন—বেসরকারি চাকরিটি। ৩০, হাজার টাকা মাসিক বেতনের সেই চাকরি হারিয়ে আজ তার পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা। নিজের চিকিৎসা, বৃদ্ধ বাবার নিয়মিত ওষুধের খরচ এবং সংসারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে তিনি এখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত।

### **উচ্চশিক্ষিত হয়েও বঞ্চনার শিকার**

রিয়াজ উদ্দিন কেবল একজন রাজপথের যোদ্ধাই নন, তিনি একজন অত্যন্ত মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত তরুণ। তার শিক্ষাজীবনের সোনালী অর্জনগুলো হলো:
* **২০১৫ সাল:** ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া থেকে ‘তাফসিরুল কোরআন’ বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে মাস্টার্স সম্পন্ন।
* **২০১৬ সাল:** ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন।
মেধাবী এই তরুণ ২০২০ ও ২০২৩ সালের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক উভয় ধাপে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেও চূড়ান্ত সুপারিশ পাননি তৎকালীন বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার কারণে।

### **“আমাকে শিক্ষক হিসেবে বাঁচতে দিন”**

সরকার কর্তৃক জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শুনে কিছুটা আশার আলো দেখতে পান রিয়াজ উদ্দিন। ৩৬ বছর বয়সী অবিবাহিত এই তরুণ আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন:
> *”সরকার যদি ২০২০ ও ২০২৩ সালের প্রাইমারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা কিংবা ২০২৫ সালের বিশেষ প্যানেল থেকে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স বিবেচনা করে জুলাই যোদ্ধা কোটায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে একটি চাকরি পুনর্বাসন হিসেবে প্রদান করে, তবে আমি আমার পরিবার নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারব। সার্টিফিকেটের হিসেবে এটিই আমার জীবনের শেষ চাকরির সুযোগ। নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আমি অত্যন্ত গর্ববোধ করব।”*
>
বর্তমানে নামমাত্র কিছু টিউশনি করে কদাচিৎ কোনোমতে দিনযাপন করলেও বৃদ্ধ বাবার দৈনিক ওষুধ কেনা এবং পরিবারের ভরণপোষণ জোগানো তার জন্য এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একজন বীর জুলাই যোদ্ধার এই মানবেতর জীবনযাপনের অবসান ঘটাতে সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তি ও রাষ্ট্রপক্ষের জরুরি ও আন্তরিক সহযোগিতা অত্যন্ত কাম্য।

46 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন