বরিশাল এলজিইডিতে রহমত-ই-খুদার ১৮ বছরের প্রভাব!

আপডেট: November 3, 2026

স্টাফ রিপোর্টার ঃঃ সরকারি  বদলি-পদায়ন নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বরিশাল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) দীর্ঘদিন ধরে একই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন, ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার এবং কথিত সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রহমত-ই-খুদা। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, প্রায় ১৮ বছর ধরে বিভিন্ন পদে ঘুরেফিরে বরিশাল অঞ্চলেই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দীর্ঘ এই অবস্থানকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে বছরের পর বছর একই অঞ্চলে বহাল রয়েছেন তিনি?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন একই এলাকায় দায়িত্ব পালনের সুবাদে কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়নকাজের দরপত্র, কার্যাদেশ ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও প্রামাণ্য যাচাই প্রয়োজন।
দীর্ঘ ১৮ বছর বরিশালেই, বদলি নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যশোরের বাসিন্দা রহমত-ই-খুদা বরিশাল জেলায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হন। অভিযোগকারীদের দাবি, পদোন্নতি হলেও কর্মস্থলের ক্ষেত্রে বরিশাল অঞ্চল ছাড়তে হয়নি তাকে।
তাদের প্রশ্ন, সরকারি চাকরিতে বদলি-পদায়নের স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে এত দীর্ঘ সময় একই অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো? তার কর্মস্থল পরিবর্তনের ইতিহাস, বদলি-সংক্রান্ত আদেশ এবং প্রশাসনিক অনুমোদন খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ, কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়নকাজে প্রভাব বিস্তার করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কাজ পাওয়া ও কার্যাদেশ-সংক্রান্ত বিষয়ে কমিশন লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন তারা।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে একটি ঠিকাদার বলয় গড়ে উঠেছে। তবে কারা এই বলয়ের সঙ্গে জড়িত, কোন প্রকল্পে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে এবং আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্যপদ, সম্পদ নিয়েও অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৩ সালে রহমত-ই-খুদা বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য হন। এরপর থেকে বদলি-পদায়নসহ প্রশাসনিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ শূন্য থাকাকালে একাধিকবার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও সামনে এনেছেন অভিযোগকারীরা।
এ ছাড়া বরিশাল নগরীর অক্সফোর্ড মিশন রোড এলাকায় তার স্থায়ীভাবে বসবাস এবং নামে-বেনামে সম্পদ থাকার অভিযোগও উঠেছে। এসব সম্পদের উৎস ও মালিকানা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়টি নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
বদলির আদেশ ঠেকানোর চেষ্টা?
এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখার একটি সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, বদলির আদেশ জারি হলে তা পরিবর্তন বা বাতিলের জন্য প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটিয়ে বরিশালেই অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
প্রকল্প শেষ, তবু কার্যালয়ে রিয়াদ; নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট?
বরিশাল জেলা এলজিইডি কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর ইমরান হোসেন রিয়াদকে ঘিরেও উঠেছে একাধিক অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন তিনি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে তার কাজ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওই সময় তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে টেন্ডার-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতেন। সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আল ইমরান তার কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অবগত হওয়ার পর তাকে কার্যালয় থেকে বের করে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে সম্প্রতি নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেক খান দায়িত্ব নেওয়ার পর রিয়াদকে আবারও ওই কার্যালয়ে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কোন প্রশাসনিক অনুমোদনে তিনি কার্যালয়ে কাজ করছেন? তার নিয়োগ, দায়িত্ব ও কাজের বৈধতা যাচাই করা হচ্ছে কি না, সেটিও এখন আলোচনায়।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেক খান বলেন, “বিষয়টি অ্যাকাউন্টস সেকশন দেখছে। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য মেলেনি
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রহমত-ই-খুদার বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে তার সরাসরি বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত চিত্র
দীর্ঘদিন একই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন, ঠিকাদারি কাজে কথিত কমিশন বাণিজ্য, বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যালয়ে কাজ করার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বরিশাল এলজিইডির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সচেতন মহলের দাবি, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। রহমত-ই-খুদার কর্মস্থলের ইতিহাস, বদলি-সংক্রান্ত নথি, ঠিকাদারি কার্যাদেশ, প্রকল্পের জনবল নিয়োগ এবং রিয়াদের কার্যালয়ে কাজ করার বৈধতা খতিয়ে দেখা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

50 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন